নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়ে সর্বত্র চলছে আলোচনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি নির্বাচনের তফসিল পূর্বে যে ধরনের প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক (বাঞ্ছনীয়) সবই রয়েছে সাংবিধানিক এই সংস্থার। এখন অপেক্ষা নির্বাচনের ক্ষণ-গণনা (কাউন্ট-ডাউন) শুরুর শুভক্ষণ। সংবিধান অনুযায়ী, আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ক্ষণ-গণনা কিংবা পরের যেকোনো দিন তারা এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে সক্ষম। এ কথা জানান সংস্থাটির অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমান। তিনি বলেন, সক্ষম হলেও আপাতদৃষ্টিতে নভেম্বরের যেকোনো দিন এ তফসিল ঘোষণার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে তাদের। তবে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদা জানুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলায় কিছুটা চমক তৈরি হয়েছে। ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান আরো বলেন, সব কিছুর পরও ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ইসির আছে।

সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। তফসিল ঘোষণার আগের প্রস্তুতি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেকোনো একটি নির্বাচনের আয়োজনে কমিশনের প্রথম প্রস্তুতিমূলক কাজের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নির্বাচন উপকরণ সামগ্রী কেনা, দরপত্র আহ্বান, সঠিক ব্যক্তিকে কার্যাদেশ প্রদান এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী কাজগুলো বুঝে নেওয়া। ৩০০ সংসদীয় আসনের নির্বাচনের কর্মযজ্ঞ বৃহৎ পরিসরের এ কারণে দুই ধাপে কেনাকাটা করতে হয় ইসিকে। নির্বাচনের কিছু উপকরণ দেশীয়ভাবে স্থানীয় মাকের্ট থেকে সংগ্রহ করা গেলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য-সামগ্রী কিনতে হয় বিদেশ থেকে। স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় উপকরণ ইতোমধ্যে সংগ্রহ শেষ হয়েছে; এগুলোর মধ্যে ব্রাশসিল, মার্কিং সিল, ফরম, প্যাকেট, ম্যানুয়ালসহ আনুষঙ্গিক সামগ্রী ইসির ভা-ারে জমা আছে। শুধু বিদেশ থেকে আনা অমোচনীয় কালির কলম ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক এখনো ইসির ভা-ারে এসে পৌঁছেনি। তবে, সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যে এটি তাদের কাছে চলে আসবে।

ইসির ক্রয় ও মুদ্রণ শাখার তথ্যমতে, এবার এই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের জন্য ৩৪ লাখ ৪০ হাজার স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ৬ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ স্ট্যাম্প প্যাড, ১৭ হাজার ৪২০ কিলোগ্রাম লাল গালা, ৫ লাখ ৭৮ হাজার অফিসিয়াল সিল, ১১ লাখ ৫৬ হাজার মার্কিং সিল, ৮৭ হাজার ১০০ ব্রাশ সিল, ৬ লাখ ৬৫ হাজার অমোচনীয় কালির কলম কেনা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার রিম কাগজ কেনা শেষ করেছে বিজিপ্রেস।

জানতে চাইলে মালামাল ক্রয়-সংক্রান্ত শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, তফসিল ঘোষণার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার তা এক-সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। কারণ ১৫ অক্টোবর কমিশন এ নির্বাচনের প্রস্তুতি সভা আহ্বান করেছে; এর আগেই সব কাজ সম্পন্ন করে ওই বৈঠকে তারা প্রস্তুত এ-সংক্রান্ত নথি তুলে ধরবেন। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ব্যালট মুদ্রণ করা হয়; এর জন্য কাগজসহ আনুষঙ্গিক যেসব উপকরণ কেনা দরকার তা-ও চূড়ান্ত করা হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যভাগের মধ্যে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি ইসির।

সূত্রমতে, জাতীয় নির্বাচনে এবার শুধু ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা লাগবে প্রায় ৭ লাখ। এর মধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার রয়েছে। এর বাইরে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, ব্যাটালিয়ন আনসার ও চৌকিদার মোতায়েন করতে হয়। এ কর্মযজ্ঞের তদারকি করছেন ইসির অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেসুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচনে আনুমানিক ৭ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা দরকার। কারণ ৪০ হাজার ১৯৯টি ভোটকেন্দ্র এবং ২ লাখ ৬ হাজার ৫৪০টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ১জন প্রিসাইডিং অফিসার, প্রতিটি কক্ষে একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দুইজন পোলিং অফিসার নিয়োগ করতে হয়।

এসব কেন্দ্র ও কক্ষের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোতায়েন করতে ইতোমধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর তাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হবে। এ ছাড়া ৬৪ জেলায় সমসংখ্যক রিটার্নিং অফিসার এবং ৩ শতাধিক সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হবে।

এদিকে, নির্বাচনের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য ৭ অক্টোবর ইসি একটি চিঠি জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর বিধান অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ ও ভোটগ্রহণে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনের উপজেলা কর্মকর্তারা সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হবেন। ফলে সারা দেশের শূন্যপদ পূরণে জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে ইসি।

ইসির সংশ্লিষ্টরা বলেন, সংসদ নির্বাচনের তফসিল মূলত ৪০-৪৫ দিন সময় ধরে ঘোষণা করে ইসি। গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪২ দিন সময় রেখে তফসিল দিয়েছিল কমিশন। এবার ৪৫ দিনের সময় রেখে ঘোষণা করার পক্ষে কমিশন। কারণ আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ নিবন্ধিত দলগুলোর সবগুলোই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক। তবে ভোটগ্রহণের তারিখ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এক বক্তব্যে। গত ৫ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগামী ২৭ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে দেশের একটি প্রভাবশালী সংস্থা ২৭ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করার বিষয়ে আগাম সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু অর্থমন্ত্রী দলীয় ফোরামে আলোচনা ছাড়াই সত্যটি বলে ফেলায় বিব্রত হয় নিজ দল আওয়ামী লীগ ও ইসি। পরে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ইসি আগামী জানুয়ারির ২৭ তারিখের আগে যেকোনো দিন এ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে পারে; এ এখতিয়ারও তাদের। এর আগে কমিশনও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু অক্টোবর নির্বাচনী সফরে সুনামগঞ্জে সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেন, নির্বাচন ডিসেম্বরে হবে- এটা আমরা বলিনি। যারা বলেছেন সেটা তাদের কথা। তারা তাদের হিসাবমতো বলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, জানুয়ারির ২ তারিখ থেকে ভোটার তালিকা হালনাগাদে ইসির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডিসেম্বরের পরে নির্বাচন গড়ালে নতুন ভোটার হওয়া নিয়ে সাংবিধানিক সংকটে পড়তে পারে ইসি। এ কারণে চলতি বছরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করায় তাদের প্রতি ইসির ইঙ্গিত রয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, চলতি অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনের প্রস্তুতি বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করতে সময় চাইতে প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন; যদি এ মাসেই তার সাক্ষাৎ মেলে তাহলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গড়ালে ভোট ডিসেম্বরের ২৬-২৭ তারিখে।

এদিকে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোট করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। এর জন্য আরপিও সংশোধন করছে কমিশন। সংসদের চলতি অধিবেশনে এটি পাস হলে প্রতীকে হলেও কিছু আসনে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে। এমনকি সিইসিও বলেন, ৩০০ আসনে ইভিএম ব্যবহারে তারা সক্ষম নন।

"