মন্ত্রিসভায় অনুমোদন

ইয়াবা বহন ও সেবনের সাজা মৃত্যুদন্ড

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাঁচ গ্রামের বেশি ইয়াবা, ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন বা কোকেন উৎপাদন, পরিবহন, বিপণনের পাশাপাশি সেবন করলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন করার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে সরকার। নতুন এই আইনে ইয়াবা ও সিসাবারকে মাদকের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি ডোপটেস্টেরও বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এই আইনে মাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলেও মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক সদস্যপদ হ্রাস করা হয়েছে মন্ত্রিসভায়। এত দিন ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন না পেলে ট্রেড ইউনিয়ন করা যেত না। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, এখন ২০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন মিললে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধনের আবেদন পাওয়ার ৫৫ দিনের মধ্যে সরকারকে নিবন্ধন দিতে হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে আপিল করা যাবে।

শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০০৬ সালের শ্রম আইন করে সরকার। ২০১৩ সালে আইনটির ব্যাপক সংশোধন করা হয়।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে এক লাখ টাকার বদলে দুই লাখ এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সোয়া এক লাখ টাকার পরিবর্তে আড়াই লাখ পাবেন। কোনো ব্যক্তি কোনো শিশু বা কিশোরকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

নতুন আইনে প্রধান পরিদর্শকের পদকে হালনাগাদ করে মহাপরিদর্শক এবং উপপ্রধান পরিদর্শকের পদকে অতিরিক্ত প্রধান পরিদর্শক করা হয়েছে। এ ছাড়া যুগ্ম মহাপরিদর্শক, উপমহাপরিদর্শক এবং সহকারী মহাপরিদর্শক ছাড়াও বেশ কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো বিদেশ থেকে চাঁদা গ্রহণ করলে সরকারকে জানাতে হবে। কোনো প্রতিবন্ধী শ্রমিককে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির কাজে অথবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না।

পরে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, নতুন এই আইনে ৫ গ্রামের বেশি ইয়াবা বহন, বিক্রি, চোরাচালানে যুক্ত থাকলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অপরাধে সর্বনিম্ন সাজা হবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড। ৫ গ্রামের কম বহনে সর্বোচ্চ ১৫ বছর ও সর্বনিম্ন ৫ বছর কারাদন্ড।

শফিউল আলম জানান, নতুন আইনে এই সময়কালে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া হেরোইন-কোকেনসহ ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত মাদকদ্রব্য ২৫ গ্রাম বা তার বেশি পরিমাণে বহনে সর্বোচ্চ মৃতু্যুদন্ড এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ২৫ গ্রামের কম বহনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের এবং সর্বনিম্ন ২ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবান্ধব নীতি সব জায়গায় কার্যকর করতে শ্রম আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে জানিয়ে শফিউল বলেন, সংশোধিত আইন অনুযায়ী কারখানার শ্রমিকদের উৎসব ভাতা দেওয়া হবে। নারী শ্রমিক প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাসহ প্রসবের পরে আট সপ্তাহ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকতে পারবেন। কোনো কারখানায় ২৫ জনের বেশি শ্রমিক থাকলে তাদের জন্য পানির ব্যবস্থাসহ খাবার কক্ষ রাখতে হবে, সেখানে বিশ্রামেরও ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শফিউল জানান, শ্রমিকরা ইচ্ছা করলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে পরে তা উৎসব ছুটির সঙ্গে ভোগ করতে পারবেন। উৎসবের ছুটিতে কাজ করালে এক দিনের বিকল্প ছুটিসহ দুই দিনের ক্ষতিপূরণ মজুরি দিতে হবে।

তিনি জানান, ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক’ শব্দটি শ্রম আইন থেকে বাদ দিয়ে সেখানে ‘কিশোর’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে। আগে ১২ বছর বয়সী শিশুরা কারখানায় হালকা কাজের সুযোগ পেত। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে।

সংশোধিক শ্রম আইন পাস হলে খাবার ও বিশ্রামের সময় বাদে টানা ১০ ঘণ্টার বেশি কোনো শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। কারখানা ও শিল্প শ্রমিকরা সপ্তাহে এক দিন এবং দোকান ও প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা দেড় দিন ছুটি পাবেন। বেসামরিক বিমান পরিবহনে নিয়োজিত পাইলট, প্রকৌশলী ও কেবিন ক্রুরা স্বীকৃতি স্ব স্ব আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্ধীকরণের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবেন। যারা সিবিএর সদস্য না তারা রসিদের মাধ্যমে চাঁদা পরিশোধ করতে পারবেন বলে জানান শফিউল।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বল প্রয়োগ, হুমকি প্রদর্শন, কোনো স্থানে আটক রাখা, শারীরিক আঘাত এবং পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বা অন্য কোনো পন্থায় মালিককে কোনো কিছু মেনে নিতে বাধ্য করলে তা অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। শ্রমকিরা বেআইনি ধর্মঘটে গেলে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। ধর্মঘট করতে আগে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের সমর্থনের প্রয়োজন থাকলেও সংশোধিত আইনে ৫১ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থন থাকার কথা বলা হয়েছে।

সংশোধিত আইন পাস হলে শ্রম আদালতগুলোকে মামলার তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিতে হবে। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে রায় দিতে হবে। এত দিন রায় দেওয়ার জন্য ৬০ দিন নির্ধারিত ছিল। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে কেউ আপিল করলে তা ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে আবশ্যিকভাবে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে তা শেষ করতে হবে।

শফিউল জানান, কোনো মালিক নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। কোনো মালিক বা শ্রমিক অসৎ শ্রম আচরণ করলে এক বছর কারাদন্ড, ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। আগে দুই বছর সাজার সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল। বেআইনি ধর্মঘট করলে আগে এক বছর কারাদন্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ড করা হতো। সংশোধিত আইনে সাজা কমিয়ে ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাজা আগের মতো পাঁচ হাজার টাকা রাখা হয়েছে।

"