সেন্টমার্টিনের অংশ দাবির তথ্য সরিয়ে নিল মিয়ানমার

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সেন্টমার্টিনকে নিজেদের ভূখন্ডের অংশ দাবি করা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমার। প্রতিবাদের মুখে ওয়েবসাইট থেকে ওই দাবি করার তথ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২০তম বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হক এ তথ্য জানান।

বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে এ বিষয়ে জোর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এরপর তারা তাদের ওয়েরসাইট থেকে এটি সরিয়ে ফেলেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি ডা. দীপু মনি বৈঠক শেষে বলেন, এটি একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। কমিটি এ বিষয়ে তৎপর থাকার এবং ওই দেশের অন্য কোনো ওয়েবসাইটে কিংবা অন্য কোথাও এ ধরনের তৎপরতা রয়েছে কিনা তা মনিটর করার সুপারিশ করে।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার সরকারের জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগের ওয়েবসাইট সম্প্রতি তাদের দেশের যে মানচিত্র প্রকাশ করেছে তাতে সেন্টমার্টিনকে তাদের ভূখন্ডের অংশ দেখানো হয়। ওই মানচিত্রে মিয়ানমারের মূল ভূখন্ড এবং বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অন্তর্গত সেন্টমার্টিনকে একই রঙে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভূভাগ চিহ্নিত করা হয় অন্য রঙে। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমার যদি এমন আপত্তিজনক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে তবে বাংলাদেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে সংসদ সচিবালয় পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে সদ্য শেষ হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপের বিবরণ উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের নেতিবাচক অপপ্রচার মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়।

কমিটির সভাপতি ডা. দীপু মনি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, মুহাম্মদ ফারুক খান, সেলিম উদ্দিন এবং বেগম মাহজাবিন খালেদ অংশগ্রহণ করেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হক ছাড়াও মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব মো. খুরশেদ আলমসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যখন থেকে বাংলাদেশের অংশ : পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। দ্বীপটি নারকেল জিঞ্জিরা নামেও পরিচিত। প্রচুর নারকেল পাওয়া যায় বলে এ নামটি অনেক আগে থেকেই পরিচিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন এবং অধ্যাপক মোস্তফা কামাল পাশা সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে গবেষণা করেছেন। কামাল পাশা বর্তমানে অবসর নিয়েছেন।

অধ্যাপক বখতিয়ার বলেন, প্রায় ৫ হাজার বছর আগে টেকনাফের মূল ভূমির অংশ ছিল জায়গাটি। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সমুদ্রের নিচে চলে যায়। এরপর প্রায় ৪৫০ বছর আগে বর্তমান সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ পাড়া জেগে উঠে। এর ১০০ বছর উত্তর পাড়া এবং পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে বাকি অংশ জেগে উঠে।

গবেষক মোস্তফা কামাল পাশা জানালেন, ২৫০ বছর আগে আরব বণিকদের নজরে আসে দ্বীপটি। তারা সেখানে বিশ্রাম নিতেন। তখন তারা এ দ্বীপের নামকরণ করেছিল ‘জাজিরা’। পরবর্তীতে যেটি নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

অধ্যাপক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, প্রায় ৩৩ হাজার বছর আগে সে এলাকায় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল। বিভিন্ন কার্বন ডেটিং-এ এর প্রমাণ মিলেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ সালে ভূমি জরিপের সময় এ দ্বীপটিকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়।

সময়টিতে মিয়ানমারও ব্রিটিশ শাসনের আওতায় ছিল। কিন্তু তারপরও সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত না করে ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক মোস্তফা কামাল পাশা।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। তবে অধ্যাপক বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, দ্বীপটিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ১৮৯০ সালে কিছু মৎস্যজীবী এ দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। এদের মধ্যে কিছু বাঙালি এবং কিছু রাখাইন সম্প্রদায়ের লোক ছিল। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় দেড় লাখ নারকেল গাছ আছে।

"