৯ মাসে আক্রান্ত ৬৪৮০, ১৭ জনের মৃত্যু

এ মাস থেকেই কমতে থাকবে ডেঙ্গুর প্রকোপ

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

পাঠান সোহাগ

রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকা ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বর্তমানে কমতে শুরু করেছে। গত কয়েক মাসের তুলনায় গত সেপ্টেম্বরে রোগীর সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। ওই মাসে মোট ৩ হাজার ৮১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি অক্টোবরে প্রথম সপ্তাহে ৪৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। যা তুলনামূলক কম। এ মাস থেকে রোগীর সংখ্যা কমবে বলে আশা করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের কর্মকর্তারা।

তারা জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৮০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ঢাকার বাইরে মাত্র চারজন। আক্রান্তদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত তিন দিনেই মধ্যে শুক্র ও শনিবার আক্রান্ত হয়েছেন ১৩২ জন। গত বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ২৩৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে এবার চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ আগের চেয়ে কম।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কার্যক্রম ও সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রমের অবহেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এমন হয়েছিল বলে অভিযোগ তাদের। এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে সর্বোচ্চ ৮৬৫ জন। এরপরই ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭০৩ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬২৪ জন, মুগদা হাসপাতালে ৫২২ জন ও মিটফোর্ডে ৪৫৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ডেঙ্গুর ধরনটাই এমন। কোনো বছর এর প্রকোপ কম হলে তার পরের বছর বেশি হতে পারে। তাই এ বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল, মৃত্যুর ঝুঁকিও ছিল। তবে এ মাস থেকে রোগীর সংখ্যা কমতে থাকবে। আর বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণত জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর এ তিন মাস আমরা ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে দেখি। অক্টোবরের শেষের দিকে এমনকি নভেম্বরে এ রোগী সংখ্যা শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।

ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮১ জন আক্রন্ত এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে আগস্ট মাসে ১ হাজার ৭৯৬ জন আক্রান্ত এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়। জুলাই মাসে আক্রান্ত হন ৯৪৬ জন এবং চারজনের মৃত্যু হয়। জুন মাসে ২৯৫ জন আক্রান্ত এবং তিনজনের মৃত্যু। অক্টোবরের মাত্র সাত দিনে দিনেই ৪৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম বিভাগে তিনজন ও খুলনা বিভাগে মাত্র একজন ডেঙ্গুতে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।

ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে ২ হাজার ৭৫৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে ৬ হাজার ৭৬ জন আক্রান্ত হয়। আর মৃত্যু হয় ১৪ জনের। ২০১৫ সালে ৩ হাজার ১৬২ জন আক্রান্ত হয়। মৃত্যু হয় ছয়জনের। ২০১৪ সালে ৩৭৩ জন, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪৭৮ জন, ২০১২ সালে ১ হাজার ২৮৬ জন, ২০১১ সালে ১ হাজার ৩৬২ এবং ২০১০ সালে ৪০৯ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০২ সালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৩২ জন আক্রান্ত ও ২০০০ সালে সর্বোচ্চ ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৯ জন ও মৃতের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে আটজনে নেমে আসে।

জানা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরের ধরন ও প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বরে এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। এডিস মশা যেন বংশবিস্তার করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসা বা বাড়ির আঙিনার কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সে বিষয়েও সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া) ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৫নং ওয়ার্ডে এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪২ ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ও রোগের লক্ষণ নিয়ে আগেই জরিপ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, আগে ডেঙ্গু জ্বরের অন্যতম লক্ষণ ছিল শরীরে র‌্যাশ থাকা কিন্তু চলতি বছরের ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে র‌্যাশ কম দেখা যাচ্ছে। ধরন পাল্টেছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গু এবার অনেক বেশি। রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাচ্ছে, রক্তপাতের ঝুঁকি বেশি থাকছে এবারে ডেঙ্গুতে।

"