অনলাইনে গুজব-উসকানি ঠেকাবে ‘সাইবার পুলিশ’

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

তথ্যপ্রযুক্তি আইন নিয়ে এখনো বিতর্ক থাকলেও এবার এই ধারায় মামলা তদন্তসহ সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পুলিশের আলাদা ইউনিট হচ্ছে। ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ নামের নতুন এ সংস্থা গঠনের প্রস্তাব এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর আগে পুলিশ সদর দফতরের প্রস্তাব যাচাই করে সাইবার পুলিশের জন্য ৫০৫ জনবল ও ৮৫টি গাড়ি অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাইবার পুলিশের প্রধান হিসেবে থাকছেন একজন ডিআইজি। শিগগিরই পুলিশের নতুন এই উইং আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের নতুন এই উইংয়ের কার্যক্রম শুরু হলে সাইবার অপরাধ কমে আসবে। পাশাপাশি আরো সঠিক ও নির্ভুল তদন্ত করা সম্ভব হবে। অপরাধীর শাস্তিও নিশ্চিত হবে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তা ব্যবহার করে নিত্য-নতুন অপরাধও বাড়ছে। সে তুলনায় সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পুলিশের প্রস্তুতিটা দুর্বল ছিল। শুধু কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম বিভাগ ক্ষুদ্র পরিসরে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। তবে এবারই প্রথম সাইবার অপরাধ ঠেকাতে পূর্ণাঙ্গ একটি ইউনিট হচ্ছে। অনলাইনে অপরাধ ঠেকাতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টহল দেবে সাইবার পুলিশ। সাইবার ক্রাইম সার্ভিলেন্স ও পেট্রলিং কার্যক্রম চালাবে নতুন এই সংস্থাটি। অনলাইন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্বেষ ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক উসকানি বন্ধেও কাজ করবে তারা। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের সব মামলার তদন্তও করবে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের প্রায় সব মামলাই ৫৭ ধারায় হলেও এতদিন ঢাকা মহানগর পুলিশের অধীন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম বিভাগের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তিতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই থানা পুলিশ মামলাগুলোর তদন্ত করে আসছিল।

২০০৬ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন হওয়ার পর ২০১৩ সালে এতে ‘বিতর্কিত’ ৫৭ ধারা যুক্ত করা হয়। এরপর থেকে ওই ধারার প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা চলছে জোরেশোরে। এটি বাতিলের দাবির প্রেক্ষিতে সে ধারাটি সম্প্রতি রহিত করে সরকার। যদিও সে ধারায় বদলে ৩২ ধারাটি যুক্ত হয়। সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে সেটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়। নতুন এই ধারাটিও বাতিলের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে সাংবাদিকরা এ ধারাটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা মনে করছেন, ‘যাহা ৫৭ তাহাই ৩২!’

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে ফেসবুক ব্যবহার করে সাইবার অপরাধ বেড়েই চলছে। এই অপরাধের বড় অংশই হচ্ছে কাউকে হেয় করে ছবি, মন্তব্য বা পোস্ট। কিছু ব্যতিক্রম বাদে এর প্রতিকার পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। শুধু কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য নয়, ফটোশপে কারসাজি করে বানানো আপত্তিকর ছবি দিয়েও হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি ফেসবুকে প্রতিপক্ষকে হেয় করতে মিথ্যা ও ভুয়া খবরও ছড়ানো হয়। সরকারের সাইবার হেল্প ডেস্কের তথ্যানুযায়ী, শতকরা ৭০ ভাগ অভিযোগই আসে নারীদের থেকে। সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে পুলিশের পাশাপাশি আইসিটি বিভাগে একটি সাইবার হেল্প ডেস্ক রয়েছে। এই ডেস্কে গত দুই বছরে ১৫ হাজারেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। কিছু অভিযোগ খুবই ভয়াবহ। অন্যের ছবিতে ছবি জুড়ে দেওয়া (সুপার ইম্পোজ) এবং পর্নোগ্রাফি। তা ছাড়া ইউটিউব ও বিভিন্ন সাইটে এসব পর্নোগ্রাফি ও ছবি ‘আপ’ করার হারও বেড়েছে।

সাইবার অপরাধকে বিচারের আওতায় আনতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার। প্রথম বছরে ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলা ছিল। ২০১৪ সালে ৩২টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি মামলা ট্রাইব্যুনালে আসে। ২০১৭ সালে তা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সাইবার অপরাধের শিকার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ অভিযোগ দেন। বেশির ভাগ ভুক্তভোগী নানা কারণে মামলার আশ্রয় নিতে চান না। এক জরিপে উঠে এসেছে, নারীদের মধ্যে ৭৭ শতাংশই ফেসবুক কেন্দ্রিক সাইবার অপরাধের শিকার।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান জানান, দিন দিন সাইবার অপরাধ বেড়েই চলছে। ২০১৫ সালে দেশে ২৬৭টি সাইবার অপরাধের মামলা হয়। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭১টিতে। ২০১৭ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে অন্তত ১ হাজার ৩০০ সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয়। যদিও সাইবার অপরাধের শিকার অনেকেই পুলিশে অভিযোগ জানাতে আসেন না। তিনি আরো জানান, জঙ্গিদের মধ্যে অন্তত ৮২ ভাগ তরুণ অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অন্ধকার পথে গেছে, যা সাইবার অপরাধের ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। তাই এসব অপরাধ ঠেকাতে সাইবার পুলিশের বিকল্প নেই। শুধু জঙ্গিবাদ নয়, আর্থিক অপরাধ, প্রতারণা, নারীদের সম্মানহানি, সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে সাইবার স্পেস ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব বিষয় কঠোরভাবে মনিটরিং করবে সাইবার পুলিশ।

কী থাকছে এই ইউনিটে : নতুন এই ইউনিটের নেতৃত্বে থাকবেন একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তার অধীনে থাকবেন অতিরিক্ত ডিআইজি, বিশেষ পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, পরিদর্শক, উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ‘সাইবার পুলিশ ব্যুরো’র জনবল সংখ্যা হবে প্রায় ৫০০ জন। শুরুর দিকে বিভাগীয় পর্যায়ে এবং পরে জেলাভিত্তিক অফিস থাকবে এই ইউনিটের। অপরাধের ধরন অনুযায়ী, একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করবেন কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে, হ্যাকিং, সাইবার ফিনান্সিয়াল ক্রাইম, আইটি এনাবলড ক্রাইম, সোশ্যাল মিডিয়া ও সাইবার টেররিজম ইনভেস্টিগেশন এবং ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ও স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম মিলে একটি শাখা। এ ছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক দুটি শাখা থাকছে।

কেন সাইবার পুলিশ : সাইবার জগতে নিত্যনতুন অপরাধ সামনে আসছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তিগত বিষয় জড়িত। আর অপরাধীরা সবসময় নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাই পুলিশ কর্মকর্তাদেরও এসব মামলা তদন্তে প্রযুক্তিগত বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য পুরান ঢাকার মিলব্যারাকে সাইবার ট্রেনিং সেন্টারে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলছে। এতে সারা দেশ থেকে পরিদর্শক ও এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নিচ্ছেন। নতুন এই ইউনিটের কাজ শুরু হলে সারা দেশের সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত সব মামলা ও ঘটনার তথ্য মনিটরিং হবে একটি অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে। অর্থাৎ ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সারা দেশের অপরাধচিত্র সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের সুবিধা পাবেন অনলাইনেই। এর ফলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

যেভাবে শুরু হয় প্রক্রিয়া : সাইবার পুলিশ ব্যুরো গঠনের বিষয়ে ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ পুলিশ সদর দফতর থেকে সিআইডির মাধ্যমে ৫৭৫ জন জনবল ও ১০০ গাড়ির প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর গত ২১ নভেম্বর ৫০৫ জনবল ও ৮৫টি গাড়ি অনুমোদন দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর প্রস্তাবটি অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ে সব শেষ প্রক্রিয়া শেষে শিগগিরই নতুন এই ইউনিটের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সাইবার হুমকির শঙ্কা : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাইবার ক্রাইমকে হুমকি হিসেবে দেখছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এই সংস্থাটির প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, নির্বাচনের সময় একটা চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়াতে পারে। তবে পুলিশ এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। মনিরুল ইসলাম বলেন, ১০ অক্টোবর গ্রেনেড হামলা মামলার রায় কেন্দ্র করে কোনো নাশকতার চেষ্টা করা হলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। এদিকে, শুক্রবার রাতে রাষ্ট্রবিরোধী গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ইউটিউব চ্যানেল এসকে টিভির অ্যাডমিনসহ দুজনকে আটক করেছে র‌্যাব।

"