কী মধু যে ওই পদে!

অবসরের পরও পদ আঁকড়ে থাকার রহস্য কী?

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৩:১১

হাসান ইমন

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বটে! চাকরি নেই, তবু বহাল তবিয়তে রয়েছেন অতিক্তি বিভাগীয় প্রধান কর্মকর্তা। এমন অবিশ্বাস্য ঘটনার জš§ হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)। এ সংস্থার অতিরিক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও তাকে ওই পদে অনির্দিষ্টকাল দায়িত্ব পালন করার বিষয়ে অফিস আদেশ করেছে ডিএসসিসি। এ ঘটনায় সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ডিএসসিসির প্রথা-বিরোধী এ অফিস আদেশের বলে ওই পদে থেকে সংস্থার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সব ধরনের ফাইল স্বাক্ষরসহ সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন ওই কর্মকর্তা। চাকরির মেয়াদ শেষে এক বছরে পূর্ণগড় বেতনে অবসরোত্তর (পিআরএল) ছুটিও নেননি তিনি। সে সময়ও একই ধরনের কাজ করেছেন। এখন ওই পদে নতুন কর্মকর্তা না আসা পর্যন্ত কাজ করতে নিজে উদ্যোগী হয়ে আবেদন করেন। এরপর ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ তার ব্যাপারে এ আদেশ করে। এ ঘটনায় ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলাবলি করছেন, এমন কী মধু রয়েছে ওই পদে যে, তিনি ওই পদ ছাড়তেই চান না। নগর ভবনের সর্বত্র এ ঘটনা নিয়ে একদিকে হাসি-ঠাট্টা হচ্ছে, অন্যদিকে পদোন্নতির সুযোগ বঞ্চিতরা চরম অসন্তোষও প্রকাশ করছেন। আলোচিত-সমালোচিত এই কর্মকর্তার নাম খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম। জানা যায়, ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক (পরিবহন), বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামকে ৩১ জুলাই ২০১৭ থেকে ৩০ জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত এক বছর পূর্ণগড় বেতনে অবসরোত্তর (পিআরএল) ছুটি মঞ্জুর করে এক অফিস আদেশ জারি করে সংস্থাটির সচিব মো. শাহাবুদ্দিন খান। ১৯ জুলাই অফিস আদেশে বলা হয়, ঢাকা পৌর করপোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ১৯৮৯ এর ২৬ (১) ও ২৫ (৩) বিধি মোতাবেক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ (বাস্তবায়ন অনুবিভাগ) হতে জারিকৃত ১ পৌষ ১৪২২ অথবা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫ এর এসআর ও নং ৩৬৯-আইন অনুযায়ী, চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ ২০১৫ এর অনুচ্ছেদ ১০ এর ২ (ক) মোতাবেক এই ছুটি মঞ্জুর করা হয়।

কিন্তু, এরপর ৩১ জুলাই ২০১৭ সালে এই কর্মকর্তাকে অবসরোত্তর ছুটি কালীন আর্থিক ক্ষমতা ব্যতিত অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দিয়ে সচিব শাহাবুদ্দিন খান এক অফিস আদেশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়, এ দায়িত্ব পালনে করপোরেশনের কোনো আার্থিক সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। তবে তিনি তার অবসরোত্তর ছুটির যাবতীয় আর্থিক সুবিধা প্রাপ্য হবেন। কর্তৃপক্ষের আনুমোদনক্রমে জনস্বার্থে এ আদেশ ১ আগস্ট ২০১৭ সাল হতে কার্যকর হবে।

সংস্থাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের এ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে এক বছর শেষ হলে আর্থিক ক্ষমতা ব্যতিত আবারও পূর্ণ পদে বহালের অনুমতি দিয়ে গত মাসের ৭ তারিখ এক অফিস আদেশ জারি করেন শাহাবুদ্দিন খান। অফিস আদেশে বলা হয়, সদ্য অবসর গ্রহণকারী খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামকে করপোরেশন সভার অনুমোদন সাপেক্ষে অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা পদে অন্য কোনো কর্মকর্তা না আসা পর্যন্ত ১ আগস্ট ২০১৮ থেকে দায়িত্ব পালন করার অনুমতি দেওয়া হলো।

এ বিষয়ে এ অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, আমার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই। ৩১ জুলাই থেকে ছুটিতে (পিআরএল) চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ছুটিতেও আবার কাজ করার আদেশ দেয় প্রশাসন। এক বছর পিআরএল শেষ হলেও নতুন করে আবার এ পদে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দেয় সিটি করপোরেশন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘ এত বছর শ্রম দিয়েছি। কোনো অবহেলা করেনি। তাই কর্তৃপক্ষ আমার প্রতি খুশি। তাই আমাকে ছাড়তে চায় না। বিনা বেতনে সিটি করপোরেশনে সময় দেবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিনা বেতনে তো নয়, তবে কিছু সম্মানী দেবে।

কিন্তু চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও ওই কর্মকর্তা এ পদে কেন থাকতে চানÑ তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে। তারা বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ শেষ হলে পিআরএল শুরু হয়। এখন পিআরএল শেষ হলেও নতুন করে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এভাবে যদি চাকরি শেষেও কোনো কর্মকর্তা পদে বহাল থেকে যান, তাহলে এটি একটি নজির হয়ে থাকবে এবং সিটি করপোরেশনের আরো অনেক কর্মকর্তা এভাবে পদ আঁকড়ে থাকার অনুমতি চাইবেন। ফলে থেমে যাবে পদায়ন।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির সচিব শাহাবুদ্দিন খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, চাকরির বিধি অনুযায়ী খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের চাকরির মেয়াদ শেষ। তবে মেয়রের একান্ত ইচ্ছায় এবং সিটি করপোরেশনের স্বার্থে তাকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এ পদে আসার মতো অভিজ্ঞ লোক না থাকায় নতুন করে পদায়ন করা হয়নি। সে কারণে তাকে এ পদে বহাল রাখা হয়েছে। নতুন করে কীভাবে রাখা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, আদেশে যদিও বিনা বেতনে রাখার কথা বলা হয়েছে তবে আসন্ন বোর্ড সভায় তাকে কীভাবে সম্মানী দেওয়া হবে সেটা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, বাইরে থেকে কর্মকর্তা নেওয়া যাবে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের স্বার্থও তো দেখতে হবে। খন্দকার মিল্লাত এ পদে একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। নতুন যারা আসবেন, তারা তো এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

কিন্তু খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের চাকরির পেছনের গল্প দেখলে বোঝা যায়, তিনি ১৯৮০ সালে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে শিশু পার্কের ‘মালি’ হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে একই স্থানে নিরাপত্তা বিভাগে কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে খন্দকার মিল্লাত সহকারী পরিবহন ব্যবস্থাপক পদে চলে আসেন। সেই সময় তিনি ১৪ গ্রেডে বেতন পান। এরপর চাকরির ধরন পরিবর্তন করে পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক পদে যোগদান করেন। সেই সময় তার বেতন অপরিবর্তিত থাকে। সেখানেও তিনি থেমে থাকেননি; চলে আসেন অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের ‘পরিহবন তত্ত্বাবধায়ক’ পদের দায়িত্ব নিয়ে। তখন বেতন স্কেল আসে ১২ গ্রেডে। এরপর ২০০১ সালে এক লাফে ১২ গ্রেড থেকে চলে আসেন ৬ গ্রেডে-‘ব্যবস্থাপক পরিবহন’ পদে। এই পদোন্নতির সময় সংস্থার তফসিল অনুমোদন সাপেক্ষে তা কার্যকর করার কথা বলা হয়। কিন্তু আজও সেই তফসিল অনুমোদন হয়নি।

আরো যে অভিযোগ ছিল, ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগে জ্বালানি খরচের নামে হরিলুট চালিয়েছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। বিনা টেন্ডারে বছরের পর বছর ধরে একই স্টেশন থেকে জ্বালানি নেওয়া, এক ট্রিপের স্থলে তিন ট্রিপের বিল তোলা, যানবাহন বসে থাকলেও জ্বালানি ইস্যু করা, একই দূরত্বে বিভিন্ন পরিমাপের জ্বালানি ইস্যু করা, কেপিএল (কিলোমিটার পার লিটার) নির্ধারণ না করেই ইচ্ছামাফিক বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও ছিল এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এর আগে খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা হিসেব অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের সময় থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় কমিউনিটি সেন্টারগুলো ‘লস প্রজেক্ট’ হিসেবে ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কমিউনিটি সেন্টারগুলো খুব সুন্দর ছিল। নানাবিধ সুবিধাও ছিল সেগুলোতে। এত সব সুবিধা থাকার পরও লাভ তো দূরের কথা, খরচটাও আসতো না। কিন্তু এর পাশেই বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট ছোট জায়গায় কমিউনিটি সেন্টার ব্যবসা লাভজনকভাবে করে যাচ্ছে। এমন ঘটনাও পাওয়া যাচ্ছে যে মাসে আয় ৫০ হাজার টাকা; সেই মাসে নানাবিধ খরচ দেখানো হয়েছে দুই লাখ টাকা।

"