স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে ঐক্য করব না : বদরুদ্দোজা

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সদ্যগঠিত ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’র শীর্ষনেতা ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল এবং আছেÑ তাদের সঙ্গে ঐক্য করব না।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া আয়োজিত ‘নাগরিক সমাবেশে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে বি. চৌধুরী এ কথা বলেন। সম্প্রতি বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামালের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া একই প্ল্যাটফর্মে কাজ করার অঙ্গীকার করে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’র যাত্রার ঘোষণা দেয়। এই জোটে ‘গণতন্ত্রকামী’ সব দলকে স্বাগতজানানোর কথা বলা হলে বিএনপি নেতাদের মধ্যেও আগ্রহ দেখা যায়। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত থাকায় তারাও জোটে যেতে পারবে কি না, এ নিয়ে কিছু স্পষ্ট হচ্ছিল না।

তবে ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশে সে বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় প্রায় অর্ধবছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা বি. চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তবে আমার পবিত্র স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, আমার পবিত্র পতাকার বিরুদ্ধে, লাখ লাখ মানুষের রক্তে ভেজা, লাখ লাখ মানুষের চোখের পানিতে ভেজা এই মাটির বিরুদ্ধে যারা ছিল, যারা আছেÑ তাদের সঙ্গে ঐক্য করব না।

বর্তমান সরকারকে ‘স্বেচ্ছাচারী ও গণতন্ত্রবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিকল্প ধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রশ্ন ছোড়েন, এ সরকার গত ১০ বছরে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, এমনি আবারও একটি অনুরূপ সরকারের ঝুঁকি আমরা নিতে পারি কি?

তিনি বলেন, সংসদে, মন্ত্রিসভায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করতেই হবে। না হলে স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করা যাবে না।

যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান বলেন, এই সরকারের কাছে জনগণের প্রশ্ন, যে স্বাধীনতা আনতে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে, লাখ লাখ মা-বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছে, এর মূল্যবোধ কেন আজ পদদলিত? দিন-রাত প্রতিটি ঘণ্টা মা-বোনেরা কেন আতঙ্কে থাকবে? কেন সবাই ভয়ে থাকবে গুম, রাহাজানি নিয়ে? পুলিশ, র‌্যাব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন অপরাধীদের ছাড় দেবে?

‘কেন ঘুষ দুর্নীতিকে ‘স্পিড মানি’ বলে সরকারিকরণ করা হলো? সমস্ত জাতির নৈতিকতাবোধকে পদদলিত করা হলো? এই অধিকার কে দিয়েছে আপনাদের? নিরাপদ সড়কের দাবিতে কচিকাঁচা কিশোরদের রাস্তায় নামতে হবে কেন, কেন, কেন? কোটা সংস্কারের জন্য আমাদের আদরের ধন মেধাবী শিক্ষার্থীদের কেন আন্দোলন করতে হবে? তাদের কী অপরাধ? কেন তাদের গুন্ডা দিয়ে, হাতুড়ি, চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করা হবে? এর জন্যই কি স্বাধীনতা?’

আরো প্রশ্ন করব? এমন প্রশ্ন করে বি. চৌধুরী বলেন, কেন আপনাদের অপরাধের প্রতিবাদে কথা বলার জন্য সভা-সমাবেশ করতে চাইলে পুলিশের অনুমতি নিতে হবে? অথচ আপনারা যখন, তখন, যত্রতত্র সভা-সমাবেশ করতে পারেন? কেন, কেন? আগামীতে আর সভা-সমাবেশে জন্য পুলিশের কাছে অনুমতির জন্য যাব না। জনগণের অনুমতি নিয়ে জনগণকে নিয়ে সভা-সমাবেশ করব।

কেন আমার ভোট আমি দিতে পারব না? প্রশ্ন করে প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, ভোটের অধিকারকে কেন দলীয়করণ করা হলো? সারা পৃথিবীতে ইভিএম পরিত্যক্ত, ইভিএম কেউ চায় না। কেন আপনাদের সুবিধার জন্য ইভিএম গ্রহণ নিতে হবে? চার হাজার কোটি টাকা কার? জনগণের টাকা।

‘আপনারা ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই ১০ বছরে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গী আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র কোথায়? কেন গঙ্গার পানি পাব না, কেন বন্ধু রাষ্ট্র তিস্তার পানি দেবে না? কেন, কেন, কেন?’

বি. চৌধুরী বলেন, এখন রুখে দাঁড়ানোর সময়, এখন অধিকার আদায়ের সময়। প্রতিবাদের কণ্ঠ ধারাল করতে হবে।

কেবল স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ভারসাম্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য বেগবান হতে পারে উল্লেখ করে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’র নেতা বি. চৌধুরী বলেন, আমরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি এবং বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করছি। আশা করি, ফলপ্রসূ হবে। আসুন, সবাই ইতিবাচক স্বপ্নে জেগে উঠতে চাই। স্বপ্নভঙ্গের অধ্যায় রচনা করার জন্য নয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব বন্দির মুক্তি দাবি করে বি. চৌধুরী বলেন, আমার স্বাস্থ্যের চিকিৎসা কাকে দিয়ে করাব সে সিদ্ধান্ত আমি নেব। এটা নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. আবদুল মঈন খান, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু, গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জোনায়েদ সাকি, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন প্রমুখ।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘ঐক্য আজকে যে হয়েছে, এই ঐক্যের মধ্য দিয়ে, দেশে মুক্তির যে শক্তি, আজকে এখানকার উপস্থিতি সেটা প্রমাণ করেছে। দেশের মানুষ জেগেছে। দেশের মানুষের জাগরণের মধ্য দিয়েই সেই শক্তি সৃষ্টি হয়, যেটা দিয়ে দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করে দেশের মানুষের শাসন, জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।’

সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য বক্তব্য দেন। জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন তারা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির স্বার্থে বিএনপি চেয়ারপারসনসহ মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা সব বন্দির মুক্তির দাবি করেন তারা।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এই দেশে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে আমাদের জাতীয় ঐক্য ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এই যে স্বৈরাচার, ভয়াবহ দুঃশাসন আমাদের বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে বসে আছে। এবং দখলদারিত্বের একটি সরকার কায়েম করেছে। তাকে সরাতে হলে জনগণের ঐক্যই হচ্ছে একমাত্র বিকল্প। অন্য কোনো বিকল্প নেই।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এই সরকার বিনা ভোটে, গায়ের জোরে আজকে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকার জন্য, রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহার বইয়ের লিখনি থেকে আপনারা তার প্রমাণ পেয়েছেন।’

একটি নতুন যাত্রা আমরা শুরু করতে যাচ্ছি উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, আশা করি, এই ঐক্য প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে আরো সুসংহত হবে। আরো সুসংগঠিত হবে এবং দেশের সকল মানুষকে, সকল দলের, সকল শ্রেণির মানুষকে সংঘবদ্ধ করবে, ঐক্যবদ্ধ করবে এই স্বৈরাচরী সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।’

সমাবেশ শেষে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন তেল-গ্যাস জাতীয় সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। সমাবেশে ঘোষণা দেওয়া হয়, আগামী ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে সভা-সমাবেশ করা হবে।

 

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিনের পরিচালনায় সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ।

"