ডিজিটাল আইন নিয়ে আলোচনা সমালোচনা

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল সংসদে পাস হয়েছে। গত বুধবার পাস হওয়া এই বিল নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আইন শুধু ডিজিটাল অপরাধ দমনে ব্যবহার হবে এর অপব্যবহার হবে না। তবে এই আইনেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধার মুখে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হলেও নতুন আইন ৩২ ধারা সাংবাদিকদের নিপীড়নের মুখে ফেলবে বলেও তাদের ধারণা।

আইনটি নিয়ে শুরু থেকেই সাংবাদিকদের আপত্তি ছিল। সম্পাদকরা আনুষ্ঠানিকভাবেই বেশকিছু ধারার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এরপর সংসদীয় কমিটি সম্পাদক এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে মতামত নেন।

সংসদীয় কমিটিতে সম্পাদক পরিষদ প্রস্তাবিত ডিজিটাল আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ধারার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপত্তি জানায়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণœ করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেফতার করতে পারবে।

আইনে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয় বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হতে পারে।

কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য উপাত্ত যদি কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে গণ্য হবে এবং এ জন্য ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

আইন অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১০ বছরের কারাদন্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে।

ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদন্ড, জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদন্ড হতে পারে।

ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে অনধিক ৫ বছরের কারাদন্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দন্ড হতে পারে।

কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের বিষয়েও বিধান রয়েছে এই আইনে। সেখানে ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ব্যাহত করে, এমন ডিজিটাল সন্ত্রাসী কাজের জন্য অপরাধী হবেন এবং এজন্য অনধিক ১৪ বছর কারাদন্ড অথবা অনধিক ১ কোটি অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।

ছবি বিকৃতি বা অসৎ উদ্দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে কারো ব্যক্তিগত ছবি তোলা, প্রকাশ করা বা বিকৃত করা বা ধারণ করার মতো অপরাধ করলে ৫ বছরের কারাদন্ড হতে পারে। ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি ও শিশু পর্নোগ্রাফির অপরাধে ৭ বছর কারাদন্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে।

কোনো ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া অনলাইন লেনদেন করলে ৫ বছরের কারাদন্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে।

বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো স্থানে বসে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এর মধ্যে করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।

সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল জাতীয় সংসদে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি এর সুফলটা মানুষ ভোগ করুন, কুফলটা বর্জন করুন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে মতামত দিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিস্বার্থ থেকে বা নিজের প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মতামত দিয়েছেন। তারা সমগ্র দেশ বা সমাজের কথা চিন্তা করে মতামত দেননি। এই বিলটা সমগ্র দেশ ও সমাজের জন্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা তারা দেখেননি। অনেক স্বনামধন্য সম্পাদক-সাংবাদিক মতামত দিয়েছেন। এখানে তো কণ্ঠরোধ হয়নি, কণ্ঠ আছে বলেই মতামত দিচ্ছে। এই বিল নিয়ে সাংবাদিকদের এত উদ্বেগ কেন প্রশ্ন করেন সংসদ নেতা।

এই আইন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল অপরাধ দমনে আইন প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন বলেও আমরা মনে করি। কখনো কখনো এই স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি আশা করেন এই আইনের অপব্যবহার হবে না এবং বাকস্বাধীনতাও রুদ্ধ হবে না।

‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এর সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘আমরা যেসব মতামত দিয়েছি সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে তার প্রতিফলন নেই। ব্রিটিশ আমলের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।’

নঈম নিজাম বলেন, ‘আমরা সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে প্রথমেই প্রস্তাবিত আইনটি প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বলেছি, এখানে যদি সংশোধনী আনা না হয়, তাহলে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমরা আইনমন্ত্রী, আইসিটিমন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমাদের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো দিয়েছি। সেই সংশোধনীগুলো গ্রহণ না করায় আমরা মনে করি আইনটি একটি কালা-কানুন হিসেবে চিহ্নিত হবে। ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট ফিরিয়ে আনা কোনোভাবে সাংবাদিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আর মানুষের যে কথা বলার অধিকার, প্রতিবাদ করার অধিকার, এটাকে আইন দিয়ে বন্ধ করা যাবে না। এই আইনে অনেক ধারা আছে, যা সাংবাদিকদের ক্ষতি ডেকে আনবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মেইন স্ট্রিম মিডিয়া এবং সামাজিকমাধ্যমকে আলাদাভাবে দেখা উচিত। মেইন স্ট্রিম মিডিয়া গুজব ছড়ায় না। রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে ঘটানো হয়েছে। আর অনেক বিষয় আছে যা প্রচলিত আইনেই বিচার সম্ভব। নতুন আইনের দরকার নেই।’

একুশে টেলিভিশনের চিফ এডিটর এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির সঙ্গে আমাদের চূড়ান্ত বৈঠক যেটা হওয়ার কথা ছিল, সেটা হয়নি, যার ফলে তারা যেটা করেছেন, সেখানে চূড়ান্তভাবে আমাদের মতের প্রতিফলন হয়নি। আমরা সংসদীয় কমিটির সঙ্গে দুইটি এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বৈঠক করেছি। কথা ছিল চূড়ান্ত করার আগে তারা আবার আমাদের সঙ্গে বসবেন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে না বসেই সংসদে নিয়ে গেছে। এর ফলে আমাদের কথার কিছু কিছু প্রতিফলন আছে। যেমনÑ আইনটির শিরোনাম পরিবর্তন করা হয়েছে। কয়েকটি জায়গায় শাস্তি কমানো হয়েছে। তবে সেটা আমাদের চাহিদামতো করা হয়নি। আমরা তথ্য অধিকার আইনটাকে আনার কথা বলেছিলাম। আইনটি আনা হয়েছে। কিন্তু ৩২ ধারা, যেটা নিয়ে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় আপত্তি। সেখানে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টটাকে এনেছে। তথ্য অধিকার আইন যখন তৈরি হয়, তখন বলা হয়েছে, অবাধ তথ্যপ্রবাহের স্বার্থে তথ্য অধিকার আইন সবচেয়ে বড় হবে। অন্য কোনো আইন তাকে বাধা দিতে পারবে না। কিন্তু এখন তথ্য অধিকার আইনও আনা হলো, আবার অফিসিয়িাল সিক্রেটস আইনকে নিয়ে আসা হলো, যে আইনটি তথ্য অধিকার আইনের কারণে অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা হলো, যা তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থায় চলে গেল।’

তিনি বলেন, ‘এটা সাংবাদিকদের জন্য হতাশাজনক। আমরা উদ্বিগ্ন এবং হতাশ। তবে আশা করি, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপপ্রয়োগ হবে না বলে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই আইনটিরও অপপ্রয়োগ যাতে না হয় সেদিকে সংসদ সদস্যরা নজর দেবেন। আমাদের উদ্বেগ বিবেচনায় নেবেন। এই আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে যদি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, তাহলে তা বড় একটি হতাশার জায়গা হবে। কারণ আমরা তথ্য অধিকার আইন এবং সম্প্রচার আইনের মাধ্যমে কিছু দূর এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু আইনটি সাংবাদিকদের নতুন করে হতাশা ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিল।’

এ প্রসঙ্গে আইন সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, আমরা এ ব্যাপারে আপত্তি দিয়েছিলাম কিন্তু তা রাখা হয়নি। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে যে আইন পাস করা হয় সেটা সংসদীয় গণতন্ত্র নয়।

"