রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা মেরুকরণ যুক্ত হচ্ছে দেশের রাজনীতিতে। বদল হচ্ছে রাজনীতির চিত্র। রাজনৈতিক দলগুলোকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা চ্যালেঞ্জের। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে প্রতিনিয়তই। পোহাতে হচ্ছে নানা ঝক্কিঝামেলা। এক সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দিচ্ছে আরেক সমস্যা।

দুই দলকেই একদিকে তৃণমূলে সাংগঠনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা, দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করা এবং জোট ও জোটের বাইরে মিত্রদের আস্থায় রাখতে হচ্ছে; অন্যদিকে, সতর্ক ও তীক্ষè নজরের মধ্যে রাখতে হচ্ছে পরস্পরকে। সবদিক সামাল দিয়ে অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে এখন পর্যন্ত বেশ আস্থাশীল ক্ষমতাসীনরা। অনেক আগেই নেমেছে নির্বাচনী মাঠে। সেই তুলনায় পিছিয়ে বিএনপি। সাংগঠনিক অবস্থাও ভালো না। তবে এসবকে পাশ কাটিয়ে বিদেশিদের দ্বারস্থ হচ্ছে দলটি। এ নিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

নির্বাচনী রাজনীতির দুটি ইস্যু এই মুহূর্তে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি হচ্ছে রাজনৈতিক দাবি আদায়ে বিএনপির বিদেশিদের দ্বারস্থ হওয়া এবং যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য-প্রক্রিয়ার রাজনীতি। এ নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনায় মুখর রাজনীতিও। ইস্যু দুটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য চালেঞ্জও বটে। দল দুটি এই চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করে সে দিকেই তাকিয়ে সবাই। কিছুটা হলেও এর ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতি-প্রকৃতিও।

নির্বাচনী দাবি আদায়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের বেশ কয়েক নেতাকে নিয়ে এখন বিদেশে অবস্থান করছেন। ইতোমধ্যেই তারা জাতিসংঘ সদর দফতরে সংস্থার রাজনৈতিক বিভাগের সহকারী মহাসচিব মিরোসøাভ জেনকার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে বিএনপির প্রতিনিধি দল। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে বিএনপি লবিস্ট নিয়োগ করেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে পলিটিকো নামে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম। এ নিয়ে অবশ্য এখনো কোনোকিছুই স্পষ্ট করেনি বিএনপি। বিশেষ করে মিরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতিসংঘের সদর দফতরের সামনে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে বেশ বিব্রত ও ইতস্তত বোধ করেছেন। এ ব্যাপারে প্রথমে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বলার মতো কিছুই নেই। এরপর বলেন, নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা কি অভিমত প্রকাশ করেছেন এ বিষয়ে কিছুই বলেননি। সবকিছু চেপে গেছেন। আবার ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কি নিয়ে কথা হলো- এর উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এটা পারসোনাল।

এ নিয়ে রাজনীতিতে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দলের পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল জাতিসংঘের মহাসচিবের আমন্ত্রণে বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রে গেছে। কিন্তু তখন জাতিসংঘের মহাসচিব ঘানায় থাকায় এবং জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিভাগের সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে কথা হওয়ায় জাতিসংঘের আমন্ত্রণের প্রকৃত সত্য নিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে রয়েছে বিএনপি। এর ফলে জাতিসংঘের কাছে যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা গিয়েছিল, সেটা পূরণ হয়নি বলেই মনে করা হচ্ছে।

অবশ্য বিএনপির এসব বৈঠকের দিকে তীক্ষè নজর রয়েছে আওয়ামী লীগের। এই বৈঠক নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই বলে মনে করছেন দলের নেতারা। এমনকি বিএনপির এই নালিশের বিরুদ্ধে দেশের ভেতর জনমত গড়তে ক্রমাগত সমালোচনা করে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই হুশিয়ারি উচ্চারণ করে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশিদের কোনো প্রকার চাপের কাছেই সরকার মাথা নত করবে না। সংবিধান অনুযায়ী, যথাসময়ে নির্বাচন হবে। তিনি বিএনপির লবিস্ট নিয়োগে ব্যয় করা অর্থের সংকুলান ও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য লবিস্ট নিয়োগ করেছে বিএনপি। কিন্তু ‘যুক্তরাষ্ট্রে তদবির চালাতে লবিং ফার্ম’ ভাড়া করার টাকা কোথায় পাচ্ছে? এর কি কোনো প্রয়োজন আছে? আওয়ামী লীগের শিকড় দুর্বল নয়, অনেক গভীরে। আমাদের চাপ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশের জনগণ এসব চাপ মানবে না।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, বিএনপির এসব বৈঠকের দিকে নজর রাখছে দল। নির্বাচনের আগে বিএনপি ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন শক্তি জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে নানা তৎপরতা চালাবে, এটা দলের বিবেচনায় আছে। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকায় এসে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আবারও বিশেষ দূত আনার বিষয়ে বিএনপির চেষ্টা থাকতে পারে। তবে চাপে ফেলে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পারবে না। বরং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে যে পরিস্থিতি ছিল, এখন তার চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ। এ ব্যাপারে দলের এক শীর্ষ নেতা জানান, আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাবেন। তখন তিনি এসব বিষয়ে খোঁজ নেবেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অবশ্য বিএনপির এই নালিশকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। তাদের মতে, আগের বিদেশিদের হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়নি। এর আগেও কমওয়েলথ মহাসচিব চিফ এমেকা এনিয়াওকু, কমওয়েলথ মহাসচিব চিফের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বিভিন্ন সময়ে এ দেশের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু কেউই সফল হননি। এরা সবাই দফায় দফায় বাংলাদেশের রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে দেশের রাজনীতিকদেরই সংকট সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে বিষয়টি বিএনপিকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জাতিসংঘের আমন্ত্রণের বিষয়টি প্রমাণ করতে না পারলে এবং লবিস্ট নিয়োগের বিষয়টি সত্য হলে বিএনপি আরেক দফা আস্থাহীনতায় পড়বে। দেশের মানুষের বিশ্বাস হারাবে। একইভাবে বিদেশিদের হস্তক্ষেপের রাজনীতিতে সরকারি দল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেও এই ইস্যুটি নির্বাচনে বিএনপির নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী দাবি আদায়ে বিএনপি আর শক্ত অবস্থান নিতে পারবে না।

অন্যদিকে, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ইস্যুটি নিয়েও দুই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপিরও যোগাযোগ চলছে। ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে বিএনপিরও অংশগ্রহণ থাকতে পারে। এমনকি ঐক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেসব দাবি পক্ষান্তরে বিএনপির দাবি বলেই মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ মনে করছে, এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পেলে ও বিএনপি সেখানে যুক্ত হতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্বাচনী দাবি-দাওয়া কিছুটা ভিত্তি পেতে পারে। সে জন্য এই ঐক্য প্রক্রিয়ার দিকে নজর ক্ষমতাসীনদের। এই জোটকেও কাছে টানতে চায় ক্ষমতাসীনরা। এমনকি ফ্রন্টের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। আমাদের ছাড়া জাতীয় ঐক্য হয় কি করে? তবে এই জোট বা ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে এখনই কিছু ভাবছে না দলটি। দলের নীতি নির্ধারকদের মতে, সরকার সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন করবে। সেখানে ছাড় দেওয়ার কিছু নেই। এ ব্যাপারে চাপ দেওয়াটাও অযাচিত। বিশেষ করে গতকাল যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্য প্রক্রিয়া যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছে, সেগুলো সংবিধান পরিপন্থি।

তবে এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে না পারলে বিএনপিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছে দলটি। দলের নীতি নির্ধারকরা জানান, নির্বাচনী দাবি আদায়ে সাংগঠনিক পরিস্থিতি দলের নেই। এর জন্য তাদের যুক্তফ্রন্ট বা বৃহত্তর ঐক্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে এই প্লাটফর্ম না পেলে বিএনপিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। এমনকি এই প্লাটফর্ম ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দাঁড়াতে পারবে না দল।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, জাতিসংঘে নালিশ করতে যাননি মির্জা ফখরুল, গেছেন দেশের বাস্তবতা তুলে ধরতে। সরকারের উদ্দেশ্য খারাপ। তারা কোনো অবস্থাতেই সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না। কিন্তু যত কথাই বলুক না কেন, সরকারকে সংলাপ করতে বাধ্য করা হবে। আমরা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছি। সেই প্রক্রিয়ায় অনেকটাই এগিয়েছি।

"