দ্বিতীয় তিস্তা সেতু

উদ্বোধনের দুই দিন আগে ধসে গেছে সংযোগ সড়ক

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট

নির্মাণ ব্যয় তিন গুণ বৃদ্ধি করেও রক্ষা করা হলো না লালমনিরহাটের দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের। উদ্বোধনের দুই দিন আগেই সেতুটির সংযোগ সড়ক ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সেতুর উত্তর পাশের সংযোগ সড়কের ইচলী এলাকার ব্রিজ ধসে পড়েছে। অথচ আগামীকাল রোববার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুটি উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

যোগাযোগব্যবস্থাহ উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বুড়িমারী স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ও রংপুর শহরে দূরত্ব কমিয়ে আনতে তিস্তা নদীর ওপর ‘দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্ধেশ্বর ও রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষীটারী ইউনিয়নের মহিপুর এলাকায় তিস্তা নদীর ওপর ২০১২ সালের ১২ এপ্রিলে সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এরই মধ্যে সেতুর কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নাভানা কনস্ট্রাকশনের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে বাস্তবায়নকারী কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল দফতর। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতুটি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সেজন্য সেতুর উত্তর পাশে মঞ্চ প্রস্তুতের কাজ চলছে। এরই মধ্যে সেতুর সংযোগ সড়কের ইচলী এলাকার একটি সেতুর মোকা ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন ওই এলাকায় নৌকায় করে চলাচল করছেন পথচারীরা। এর আগেও সেতুর মোকা ধসে পড়লে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করে সংশ্লিষ্ট দফতর।

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ফুটপাতসহ ৯.৬ মিটার প্রস্থের দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ১৬টি পিলার, ২টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ১৭টি স্প্যানে ৮৫টি গার্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেতুটি। এই টাকার মধ্যে সেতুটি রক্ষার জন্য উভয় পাশে ১৩০০ মিটার নদী শাসন বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর সঙ্গে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের কাকিনা থেকে সেতু পর্যন্ত ৫.২৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ‘দুটি প্যাকেজে ৪ কোটি ৪৬ লাখ এবং এ সড়কে দুটি সেতু ও তিনটি কালভার্ট নির্মাণে তিনটি প্যাকেজে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সেতু থেকে রংপুরের অংশে ৫৬৩ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

প্রথমে সড়ক নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও এই ৫ কিলোমিটার সড়কে ৩ দফায় মোট ১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ধস থেকে ব্রিজকে রক্ষা করতে পুনরায় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সংস্কার কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কামাল অ্যাসোসিয়েট স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছায়া ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করে। কাজ শেষ না হতেই গত বৃহস্পতিবার রাতে ইচলী এলাকার সেতুর মোকা ধসে পড়লে স্থানীয়রা বালুর বস্তা ফেলে পানির স্রোত রক্ষা করেন। নিম্নমান কাজের কারণে উদ্বোধনের দুই দিন আগেই সড়ক ধসে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয়রা জানান, সংযোগ সড়ক নির্মাণের শুরু থেকে কাজের মান নিয়ে অভিযোগ করেও সুফল মেলেনি। নিম্নমানের কাজ ঢাকতে চার দফায় সংস্কার করেও চলাচলের উপযোগী করতে পারছে না প্রকৌশল দফতর। নদী শাসনের ১৩০০ মিটার বাঁধ অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

তাদের দাবি, তিস্তার মূল স্রোতধারা সেতু হয়ে না গিয়ে লোকালয় হয়ে যাচ্ছে। এতে লোকালয় ভাঙছে, সেই সঙ্গে ভেঙে যাচ্ছে এই ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও সেতু-কালভার্ট। এই সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় উদ্ধোধনের আগেই তিস্তা দ্বিতীয় সড়ক সেতুটি অকার্যকর হয়ে পড়ল।

সেতু এলাকার নুরুজ্জামান আহমেদ, সাইফুল ইসলাম ও কামরুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, নাম মাত্র কাজ দেখিয়ে এই প্রকল্পের অর্থে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের পকেট মোটাতাজা হয়েছে। প্রতিবাদ করলে চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতারের হুমকি দিত তারা।

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, নদী প্রতি মুহূর্তে গতিপথ পরিবর্তন করে থাকে। সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা যখন করা হয়, সে সময়ের গতিপথ অনুযায়ী সেতু ও নদী শাসন বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এখন নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। এটার দায় তার নয়। উল্টো পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, উদ্বোধন অনুষ্ঠান যথা সময়ে হবে। ধসে যাওয়া অংশ দ্রুত মেরামত বা সাময়িক যোগাযোগের জন্য ব্যবস্থা করতে প্রকৌশল বিভাগ কাজ করছে।

"