কমছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ অক্টোবরেও বাড়ার আশঙ্কা

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

পাঠান সোহাগ

রাজধানীতে বেড়েছে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। গত কয়েক মাসের তুলনায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অক্টোবরে এ সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের কর্মকর্তারা।

তারা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন হাসপাতালে ৫১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এ বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝির মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের শিকার হয়ে ১১ জনের মৃত্যুও হয়েছে। এত অল্প দিনে ১১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা। ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করে ১৪ জন। ১-১৩ সেপ্টেম্বর মধ্যে ১ হাজার ১২৮ জন রোগী ভর্তি হয়। আর বছরের শেষ তিন মাস ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমতে পারে বলে ধারণা করছেন স্বাস্থ্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্যমতে, গত আগস্টে ১ হাজার ৬৬৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জুন, জুলাই মাসে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরে মোট ৩ হাজার ৩৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিকিৎসক আয়শা আক্তার বলেন, সরকারি-বেসরকারি ২২টি হাসপাতালের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই সংখ্যাই সরকারিভাবে ব্যবহার হচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কিছু বেশি হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ১১ জনের মধ্যে আটজন মারা গেছে ‘হেমোরেজিক শক’-এর কারণে। ডেঙ্গু রোগের এই পরিস্থিতিতে রক্তক্ষরণ হয়। অনেকের মলের সঙ্গে রক্ত যায়। আট বছরের একটি শিশু জ্বরে ভোগার পরপরই মারা যায়। দুজন মারা গেছে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে’। এই পরিস্থিতিতে রোগী প্রবল জ্বরে অচেতন হয়ে পড়ে। মৃতদের মধ্যে চারজনের বয়স ছিল ১০ বছরের নিচে। একটি শিশুর বয়স ছিল এক বছর সাত মাস। একজন ছিলেন ২৭ বছর বয়সী।

ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্টোল রুমের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে ২ হাজার ৭৫৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে ৬ হাজার ৭৬ জন আক্রান্ত হয়। আর মৃত্যু হয় ১৪ জনের। ২০১৫ সালে ৩ হাজার ১৬২ জন আক্রান্ত হয়। মৃত্যু হয় ছয়জনের। ২০১৪ সালে ৩৭৩ জন, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪৭৮ জন, ২০১২ সালে ১ হাজার ২৮৬ জন, ২০১১ সালে ১ হাজার ৩৬২ এবং ২০১০ সালে ৪০৯ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০২ সালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৩২ জন আক্রান্ত ও ২০০০ সালে সর্বোচ্চ ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৯ জন ও মৃতের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে আটজনে নেমে আসে।

জানা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরের ধরন ও প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। চলতি বছর যারা মারা গেছে, তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, জুন থেকে অক্টোবর এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজননও বাড়ে। এ জ্বর থেকে রক্ষা পেতে হলে এডিস মশা যেন বংশবিস্তার করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসা বা বাড়ির আঙিনার কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিরাময়যোগ্য রোগ। তবে নারী ও শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। এজন্য মৃতের সংখ্যায় তারাই এগিয়ে।

এদিকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে চলমান কর্মসূচি আরো জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সংস্থার আঞ্চলিক ৭১তম অধিবেশনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, ডেঙ্গু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় ১৩০ কোটি মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পুনম ক্ষেত্রপাল সিং বলেন, কীটপতঙ্গ দমনে জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে কর্মসূচি নিতে হবে। এজন্য নজরদারির পাশাপাশি আন্তদেশীয় সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই অঞ্চলে বিশ্বেও মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বসবাস করে। মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকা বৈশ্বিক জনগেষ্ঠীর ৫৮ শতাংশ এই অঞ্চলে বাস করে। দ্রুত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলে এই দুই রোগ ছড়াও কীটবাহিত অন্য রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

"