ভূরিভূরি অভিযোগ : নিষ্পত্তি হয়নি একটিরও!

অপারেটরদের হাতে ‘জিম্মি’ মোবাইল ব্যবহারকারী

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবা ও পণ্য নিয়ে দিন দিন অসন্তোষ-ক্ষোভ বাড়ছে। ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) এবং গ্রাহক সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে বিস্তর। আবার মুঠোফোন গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা কেটে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও আছে মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে। থ্রিজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু হলেও কলড্রপ হচ্ছে যখন তখন। আর ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহারের নামে চলছে রীতিমতো প্রতারণার মহোৎসব। দিন দিন অপারেটরদের বিরুদ্ধে জমা হচ্ছে গ্রাহকদের অভিযোগের পাহাড়। সেই সঙ্গে বাড়ছে অসন্তোষ-ক্ষোভ। কিন্তু মিলছে না সমাধান। মোবাইল অপারেটরগুলো নিজেদের সাফাই গাইলেও মুঠোফোন গ্রাহকরা মনে করছেন তাদের জিম্মি করে রাখা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযোগ কেন্দ্রে মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে এক হাজার ৪৩৬টি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই দেড় হাজার অভিযোগের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়নি একটিরও। মোবাইল অপারেটরগুলোর কোনো সেবা নিয়ে অসন্তোষ থাকলে গ্রাহকরা প্রথমে ছুটে যান অপারেটরগুলোর গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে। যদিও সেসব সেবা কেন্দ্রের মান নিয়ে আছে গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগ।

মোবাইল অপারেটরগুলোর কাছ থেকে গ্রাহকরা সরাসরি, কল সেন্টার এবং অনলাইনে লাইভ চ্যাট; এই তিনভাবে সেবা নিতে পারেন। লাইভ চ্যাটের মাধ্যমে খুবই সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হয়। তাই গ্রাহকদেরকে কল সেন্টার অথবা সরাসরি সেবা কেন্দ্রে গিয়ে সেবা নিতে হয়। কল সেন্টারে ফোন দিলে প্রথমেই ‘অঙ্কের ক্লাসে’ বসতে হয় গ্রাহকদের। বিভিন্ন সেবার ধরনের নামে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত বিভিন্ন নম্বরে চাপ দিতে বলা হয়। একটি নম্বরে চাপ দিয়ে এক ধরনের সেবায় গেলে আবার আরেকটি নম্বর। এভাবে কয়েক দফা বিভিন্ন নম্বর চাপার পরও গ্রাহকসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হলে অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘক্ষণ।

একই অবস্থা গ্রাহকসেবা কেন্দ্রগুলোতেও। ব্যস্ততম জায়গায় পর্যাপ্ত গ্রাহকসেবা কেন্দ্র নাই, গ্রাহকদের অনুপাতে কর্মী সংখ্যাও কম, এ জন্য সেবা কেন্দ্রগুলোতেও সেবা পেতে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘক্ষণ। গ্রাহকসেবা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারে আর উৎসাহ দেখান না অনেকে। মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে সমাধান পেতে বেশ নাজেহালই হতে হয় গ্রাহকদের। ভোক্তা হিসেবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বিষয়ে অভিযোগ জানানোর জন্য গ্রাহকরা প্রথমেই যান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কেন্দ্রে। কিন্তু সেই সংস্থাটি মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো উৎসাহই দেখায় না।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত টিসিবি ভবনে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (তদন্ত) মাসুম আরেফিন বলেন, মোবাইল অপারেটরগুলোর পক্ষে করা এক রিটের কারণে উচ্চ আদালতে এক আদেশ জারি হয়। ২০১৭ সালের ২৮ মে জারি করা ওই আদেশে মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। যেসব অভিযোগ আসে আমরা শুধু সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখি। কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

তবে মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকদের এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। গ্রাহকদের অভিযোগ এবং অসন্তোষের জবাবে প্রতিটি মোবাইল ফোন অপারেটরের বক্তব্য কমবেশি একই রকম। ব্যবহৃত ইন্টারনেট যাচাইয়ের জন্য নিজেদের পাঠানো এসএমএস এবং মোবাইলভিত্তিক অ্যাপসেই ভরসা রাখতে হবে বলে জানায় গ্রামীণফোন এবং বাংলালিংক। আর কলড্রপ হলে গ্রাহকদেরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ‘মিনিট’ দেওয়া হয় বলে জানায় অপারেটরগুলো। অন্যদিকে, ভ্যাস (ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস) সেবার নামে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে স্বয়ংক্রিয় টাকা কাটার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে অপারেটরগুলো। আর গ্রাহক সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে গ্রাহকদের আরো উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বলে দাবি অপারেটরগুলোর। এ ছাড়া মোবাইল, ডেটা ও অফারের ক্ষেত্রে বিটিআরসির নিয়ম-নীতি মেনেই সবকিছু করা হয় বলে দাবি তাদের।

এদিকে, মোবাইল ডাটার ক্ষেত্রে অপারেটরগুলোর এসএমএসের ওপরেই নির্ভর করতে হবে জানিয়েছে বিটিআরসিও। তবে মোবাইল অপারেটরগুলোর ইন্টারনেট ডাটা, ভয়েস কল এবং গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের ওপর বিটিআরসি নিয়মিত অডিট করে বলে জানিয়েছেন বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) জাকির হোসেন খান। মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে গ্রাহকদেরকে তা বিটিআরসিকে জানানোর পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা। অপারেটরগুলোর গ্রাহকসেবা কেন্দ্র থেকে যদি কাক্সিক্ষত সেবা কোনো গ্রাহক না পেয়ে থাকেন এমনকি গ্রাহক সেবা নিয়েও যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে ১০০-তে কল করে তা বিটিআরসিকে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।

কলড্রপ ও ডাটা ব্যবহারে অসন্তোষ বাড়ছে : গ্রাহকদের মধ্যে অনেকদিন থেকেই কলড্রপ ইস্যুতে অসন্তোষ বিরাজ করছে। কলড্রপ ও ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহারে গ্রাহকদের মাঝে দিন দিন বাড়ছে অসন্তোষ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক ফোরজি চালু হওয়ার পর থেকে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু থ্রিজি এবং ফোরজি উভয় ধরনের সংযোগে এখনো রয়ে গেছে সমস্যা। তাই কলড্রপ বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি মেলেনি গ্রাহকদের। এ ছাড়া ডাটা প্যাকেজ ও তার মেয়াদ বিষয়ে গ্রাহকদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ক্রয় করা ডাটা কতটুকু ব্যবহৃত হলো, তা যাচাই করার কোনো উপায় নেই গ্রাহকদের কাছে। এসব কারণে নিজেদেরকে এক প্রকার জিম্মি মনে করছেন মুঠোফোন গ্রাহকরা।

কলড্রপ বিড়ম্বনার শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জারিফ রহমান চৌধুরী তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, মাঝে মাঝেই কথা বলার মাঝখানে হঠাৎ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক সময় আবার সংযোগ থাকলেও অন্যপাশ থেকে কোনো শব্দ পাই না। আমার কথাও অন্যজন শুনতে পায় না। তখন বাধ্য হয়ে আমাকেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হয়। এতে অল্প সময়ের কথা অনেক সময় নিয়ে বলতে হয়। এতে মোবাইলের বিল বাড়ে। অনেকবার গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করেছি। তারা শুধু ‘দুঃখিত’ আর ‘দেখছি’ বলেই জবাব দেন। তবে আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পেলাম না। থ্রিজি থেকে এখন আমরা ফোরজিতে আছি। এখনো এমন নেটওয়ার্ক সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বায়জিদ তালুকদার জানান, মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়াশুনার অনেক কাজ করেন তিনি। তাই বিভিন্ন মেয়াদ ও পরিমাণের ডাটা প্যাকেজ কেনেন। কিন্তু প্রায়ই তার কেনা ডাটার হিসাব-নিকাশ মেলাতে পারেন না এই শিক্ষার্থী। তিনি জানালেন, কিছুদিন আগে এক জিবির ইন্টারনেট প্যাক কিনি। কিছু সময় নেট ব্যবহারের পর মেসেজ এলো আমার আর ৪০০ এমবি বাকি আছে। এর মানে হচ্ছে, আমি প্রায় ৬০০ এমবি খরচ করে ফেলেছি। কিন্তু শুধু ফেসবুক ইউজ করে এত এমবি খরচ হওয়ার কথা নয়। আমি কীভাবে ৬০০ এমবি খরচ করলাম তা জানারও উপায় নেই। এভাবে গ্রাহকর গলা কাটছে অপারেটররা।

এ ছাড়া অভিযোগ আছে গ্রাহকদের নম্বরে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চালু হয়ে যায় বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস বা ভ্যাস। আর এর জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গ্রাহকদের মোবাইল থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া হয়। এসব বিষয়ে টেলিকম প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং পোলারিস ফরেনসিক লিটিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানভীর হাসান জোহা বলেন, গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষায় একটি অডিট ব্যবস্থা বিটিআরসির কাছে থাকা উচিত। বিটিআরসির বিলিং সার্ভারে এর অডিট করার ক্ষমতা সংস্থাটির আছে। তবে নিয়ম করে সেই সার্ভার অডিট করা হয় কি না সেটিই হচ্ছে দেখার বিষয়। কারণ কেউ যদি কোনো ধরনের এদিক-ওদিক করেও লগ সার্ভার থেকে লগ মুছে ফেলা যায় না। গ্রাহক হয়রানি ঠেকাতে ভোক্তা অধিকার কিংবা বিটিআরসিতে অভিযোগের পরামর্শও দেন তিনি।

সেবার মান নিশ্চিতকরণে নীতিমালা : বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, অপারেটরগুলোর সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য ইতোমধ্যে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। কোয়ালিটি অব সার্ভিস গাইডলাইন নামের ওই নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে। নীতিমালা পাস হলে গ্রাহকদের প্রতি অপারেটরগুলোর সেবার মান বাড়বে বলে ধারণা সংস্থাটির। এ ছাড়া নীতিমালার ফলে অপারেটরগুলোর জবাবদিহিও বাড়বে বলে মনে করছে টেলিকম বিশেষজ্ঞরা। গ্রাহকদের প্রতি সেবার মান বজায় রাখতে না পারলে অপারেটরগুলোকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানার সুপারিশ করা হয়েছে নতুন নীতিমালায়।

"