আলাদা রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহায়ক সরকারের আলাদা রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যের নেতারা। রূপরেখার কাজ শেষ হলে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে সেটি তুলে দেওয়া হতে পারে। রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধও জানাতে পারে বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নানা বাধাবিপত্তি দেখতে পেলেও নির্বাচনের পথেই হাঁটছে বিএনপি। দলটির নেতারা মনে করছেন, জনমত তাদের পক্ষে থাকায় সরকার বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাইছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচন করার সুযোগ সরকারকে দিতে রাজি নন তারা। সরকারি দল থেকে ইতোমধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও দাবিকৃত সহায়ক সরকারের রূপরেখা বিএনপি এখনো প্রকাশ করেনি। দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন রূপরেখা প্রায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বৃহৎ জাতীয় ঐক্য গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায়, সেই রূপরেখা দিতে আরো সময় নিচ্ছে বিএনপি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে আগামী মাসে। আর চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে পারে নির্বাচন। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি দীর্ঘদিন যাবৎ নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি রাজনীতির তৃতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্যও নির্বাচন সামনে রেখে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তাব করেছে।

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি নির্দলীয় ‘সহায়ক সরকারের’ প্রস্তাবসংবলিত রূপরেখা প্রণয়নের কাজ শেষ করেছে। সেটি এখন জোট নেতাদের মতামত ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের হাতে তুলে দিতে পারে। বিএনপির প্রস্তাবে, সংবিধান সংশোধন করে কিংবা সংশোধন ছাড়াই ওই সরকার গঠনের কথা থাকবে। দুই প্রস্তাবেই হয় প্রধানমন্ত্রী পদে নিরপেক্ষ কেউ অথবা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করার বিষয়টি থাকছে। অথবা নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ছুটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও থাকছে। এই সহায়ক সরকার হবে তিন মাস মেয়াদের। রাষ্ট্রপতির অধীনে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় স্বরাষ্ট্র ও সংস্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব থাকবে। রাষ্ট্রপতি নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের এসব মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেবেন। রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকারের’ কাঠামো চূড়ান্ত করতে পারেন।

তবে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাইছে জাতীয় ঐক্যের দলগুলো। এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে একটি রূপরেখাও তৈরি করা হচ্ছে। সংবিধান মেনে কীভাবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায় সে বিষয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে রূপরেখা তৈরি করছেন কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী। এই রূপরেখা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার।

রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. কামাল ও তার সমমনাদের কোনো আপত্তি থাকবে না বলেই মনে করা হয়। জাতীয় ঐক্যের রূপরেখা অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান দলীয় প্রধানমন্ত্রী অকার্যকর হয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে কোনো দফতর বা প্রায়োগিক কোনো ক্ষমতা থাকবে না।

তবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জাতীয় ঐক্যের নেই। বরং যখনই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে, তখন সচিবদের নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে দলটি। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে নির্বাচনকালীন সরকারের কার্যক্রম, এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা হবে গৌণ।

এ ছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২ অনুযায়ী, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নির্বাচন পূর্ব সময়ে তাদের ক্ষমতার বলয় সংকুচিত হয়ে যায়, তারা বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন না। যেহেতু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, সেহেতু সাংবিধানিকভাবেই তার সব ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে যাবে এবং রাষ্ট্রপতিই সরকারের সব দায়িত্ব পালন করবেন। এমন প্রস্তাব রেখেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে জাতীয় ঐক্য।

এসব বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে বিএনপি সংগ্রাম করছে। আমরা মনে করি, বর্তমান ব্যবস্থায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই সব দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হতে পারেÑ এমন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে বিএনপি ও বিএনপির বাইরের কিছু দল। শিগগিরই এর একটি অগ্রগতি দেশবাসী দেখতে পাবে।

"