জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জোট নিয়ে তোড়জোড়

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, নানা মেরুকরণ তত যুক্ত হচ্ছে চলমান জোট-মহাজোট রাজনীতিতে। একদিকে যেমন প্রধান দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সম্প্রসারণের কথা শোনা যাচ্ছে; তেমনি এসব জোটের বাইরেও বিভিন্ন জোট ও দলকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের আলোচনাও রয়েছে রাজনীতিতে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা বিচার-বিশ্লেষণ। জোট সম্প্রসারণ ও ঐক্যে শরিক হতে নানা ছাড়ের কথাও শোনা যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। চলমান পরিস্থিতিতে এই জোট রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এ ব্যাপারে সমঝোতা ব্যতীরেকে জোট ও জোটের বাইরে এখনই আসন ভাগাভাগিতেও যেতে নারাজ দলগুলো। এমনকি এসব জোট-মহাজোটকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ভর করছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে এই বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপির কাছে। দুর্নীতির মামলায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় এবং দলের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই নাজুক হওয়ায় নির্বাচনী রাজনীতির অনেক কিছুর জন্যই এখন এই বৃহত্তর ঐক্যের দিকে তাকিয়ে দলটি। এমনকি এই বৃহত্তর ঐক্য দিয়েই খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ দলীয় এজেন্ডাও পূরণ করতে চায় তারা। এ জন্য সর্বোচ্চ ছাড় দিতেও প্রস্তুত দলের নেতারা।

বসে নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও। দলের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সম্প্রসারণের কথা যেমন শোনা যাচ্ছে, তেমনি পরিস্থিতি বুঝে আরো এক বা একাধিক জোট গঠনের আলোচনাও রয়েছে রাজনীতিতে। বিশেষ করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ও এই ফ্রন্টের ব্যানারে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা শোনা যাচ্ছে, সেদিকে সতর্ক নজর রয়েছে দলের। এই জোট বা ঐক্যকেও কাছে টানতে চায় ক্ষমতাসীনরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব জোট বা জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে এখনই কিছুই বলা যাচ্ছে না। সবকিছু নির্ভর করবে বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার ওপর। ক্ষমতাসীনরাও সেদিকেই তাকিয়ে। সরকার চাইছে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু করতে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি অংশ না নিলে এক হিসাব। আর নিলে আরেক হিসাব। তবে এসব বৃহত্তর ঐক্য বা জোটের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের ওপর কতটুকু আস্থাশীল হতে পারে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব জোটের সফলতা নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশের ওপর। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী নির্বাচন প্রশ্নে অনেক দলের সঙ্গেই আলোচনা হচ্ছে। আরো অনেকের সঙ্গে হবে। এদের কেউ জোটে আসবে, কেউ আসবে না। আবার বৃহৎ জোটও হতে পারে। তবে জোট-মহাজোট যেটাই হোক, আশা করছি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন জোটের বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণতন্ত্র, মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের বিষয়ে ২০ দল সম্মত হয়েছে। নির্বাচনী প্রস্তুতিও চলছে। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করার জন্য সবাই কাজ করবেন। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত হবে এই জোট একসঙ্গে নির্বাচন করবে কি না। কার নেতৃত্বে নির্বাচন হবে, তা তখনই ঠিক করা হবে। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আমরা আন্দোলন করবো। দাবি আদায়টাই এখন মুখ্য।

সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে জোট-মহাজোট রাজনীতিতে বিশেষ কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ বড় দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী কৌশলের ওপর নির্ভর করবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট বা মহাজোট গঠনের বিষয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে মহাজোট সঙ্গে নিয়ে এগোবে ক্ষমতাসীনরা। আর না নিলে হিসাব হবে অন্যরকম। বাম এবং ইসলামী ঘরানার দলগুলোর সঙ্গেও ক্ষমতাসীনদের ঐক্য হতে পারে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নেয়া হতে পারে নানা ধরনের পদক্ষেপ। বোঝাপড়ার মাধ্যমে এসব দল আওয়ামী লীগের কাছে ‘নির্বাচনী’ ছাড়ও পেতে পারে। এই মাস জুড়েই চলবে ক্ষমতাসীনদের এই জোট-মহাজোট রাজনীতি।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মধ্যকার বৈঠক জোট-মহাজোট রাজনীতির গুরুত্বকে আরেক দফা বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদিও এই বৈঠককে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে দাবি করেছেন এইচ এম এরশাদ। তবে জাপা সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সেই সরকারে জাপার কতজন থাকবেনÑ তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপি অংশ নিলে কীভাবে নির্বাচন হবে, অংশ না নিলে কীভাবে করা যায়Ñ সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে বিএনপি যদি অংশ নেয় তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের আকার যতটা সম্ভব বড় করার কৌশল নেবে ক্ষমতাসীনরা। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের সব শরিকসহ আরো বেশ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে একটি মহাজোটও হতে পারে। আর বিএনপি ভোটে না এলে আওয়ামী লীগ শুধু ১৪ দলগতভাবে নির্বাচন করবে। তখন জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে একটি জোট এবং অন্যান্য দল আলাদাভাবে নির্বাচন করবে। ছোট ছোট দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হবে।

দলীয় সূত্রগুলো এমনও জানায়, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসতে একটি বৃহৎ জোট গঠনের প্রস্তুতি আছে দলের মধ্যে। এই মহাজোটে সমমনা দল ছাড়াও বাম ও ইসলামী ধারার দলগুলোও থাকতে পারে। জোট সম্প্রসারণে এরই মধ্যে একাধিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বসে নেই দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। গত জুলাই মাসে তিনি বেশ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সশরীরে সাক্ষাৎ ও টেলিফোনে আলাপ করেছেন।

এই দুই জোটের বাইরে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টকেও কাছে টানতে চায় ক্ষমতাসীনরা। এমনকি ফ্রন্টের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। আমাদের ছাড়া জাতীয় ঐক্য হয় কি করে? পাশাপাশি ইসলামিক ফ্রন্ট, ইসলামভিত্তিক সাতটি দলের একটি জোট আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। সব মিলে আগামী নির্বাচনে বিএনপি না এলে যত বেশি সম্ভব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। তবে এই ঐক্য প্রশ্নে যুক্তফ্রন্টের যে দাবি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঐক্য প্রশ্নে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না নির্বাচনে জয় হলে তাদের প্রথম দুই বছর সরকার পরিচালনা করতে দেওয়ার দাবি জানান। একইভাবে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, তাদের ১৫০ আসন দিতে হবে। এর আগে যুক্তফ্রন্ট জামায়াতে ইসলামীকে না ছাড়লে বিএনপিকে ঐক্যে নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে দেয়।

এমন প্রেক্ষাপটে এই ঐক্য গঠন নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যদি এমন হয়, বিএনপি এই ঐক্যকে ব্যবহার করে দলীয় স্বার্থ আদায় করে সরে গেল। কেননা এসব ঐক্যের ব্যাপারে এখনো কোনো আস্থার জায়গা তৈরি হয়নি। বিশেষ করে জামায়াতকে আদৌ বিএনপি ছাড়বে কি না, সেটাও সন্দেহ রয়েছে।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, বিএনপি এবার নির্বাচন হাতছাড়া করতে চায় না। নির্বাচনের ব্যাপারে জেলে থাকা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও লন্ডনে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। নির্বাচন ঘিরেই এখন দলের প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহত্তর জোট নিয়ে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে।

এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সবই আলোচনার পর্যায়ে। আলোচনা চলছে। তবে আমরা জাতীয় ঐক্য চাই। সরকারের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে এক জায়গায় আসতে চাই।

 

"