কুলাউড়া-শাহবাজপুরে আবার ছুটবে ট্রেন

হাসিনা-মোদি আজ পুনঃস্থাপন কাজের উদ্বোধন করবেন

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশ্বজিৎ দাস, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)

‘ঝক ঝকা ঝক ট্র্রেন চলেছে-রাত দুপুরে ওই, ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে-ট্রেনের বাড়ি কই?’ প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের জনপ্রিয় এই কবিতা কার না জানা। ট্রেন চলার ছন্দও মন কাড়ে যেকোনো মানুষের। আর সেই ট্রেনের অপেক্ষায় থাকাও আনন্দের। সেই আনন্দেই ভাসছে কুলাউড়াবাসী। কুলাউড়া-বড়লেখাবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে। আজ সোমবার প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন সংস্কার কাজ আবার শুরু হচ্ছে। বিকেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনকারী এই রেললাইন পুনঃস্থাপন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

রেললাইনটি আবার চালুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন এলাকাবাসী। অবশেষে পরিত্যক্ত রেললাইনটি পুনঃস্থাপনের খবরে কুলাউড়া, বড়লেখা, জুড়ী ও বিয়ানীবাজার উপজেলার জনসাধারণের মধ্যে দেখা দিয়েছে উৎসবের আমেজ।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৫ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অংশ হিসেবে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন চালু হয়েছিল। বড়লেখা উপজেলার লাতু সীমান্ত দিয়ে কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন হয়ে আসাম রেলওয়ের ট্রেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আসা যাওয়া করত। কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাইনে চলাচলকারী ট্রেনটি এলাকাবাসীর কাছে ‘লাতুর ট্রেন’ নামে পরিচিত ছিল। চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া রেললাইনটি সংস্কার করার বদলে তা ২০০২ সালের ৭ জুলাই বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

পরে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী মো. শাহাব উদ্দিন (বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ) অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল বিজয়ী হলে কুলাউড়া-শাহবাজপুর ট্রেনলাইন চালু করবেন। পরে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করলে লাইনটি চালুর জন্য ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালান। একাধিকবার সংসদে দাবি উত্থাপন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ৯ নভেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বড়লেখা সফরকালে বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত জনসভায় তার বক্তব্যে রেললাইন চালুর ঘোষণা দেন। পরে ২০১৫ সালের ২৬ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্প অনুমোদন হয়। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিবে ১২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ভারত সরকার ৫৫৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ৪৪ দশমিক ৭৭ কিলোমিটারের পুরোটাই ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে সাত দশমিক ৭৭ কিলোমিটার লুপ লাইনের কাজ হবে। ওই বছরের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এলে পরদিন ৭ জুন ঢাকায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে অন্য প্রকল্পের সঙ্গে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন প্রকল্পেরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

এদিকে, উদ্বোধন উপলক্ষে কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন সংলগ্নে ফলক নির্মাণ এবং ভিডিও কনফারেন্সের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রেললাইন সংস্কার কাজ ও উদ্বোধনী মঞ্চ পরিদর্শন করে গেছেন রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন, রেল পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম খন্দকার ও মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তোফায়েল ইসলাম। উদ্বোধন উপলক্ষে রেল মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট দফতর, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিন উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের কুমারশাইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঝলঙ্গা ও কাঁকড়িছড়া পুরাতন রেলব্রিজ ভাঙার কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। শ্রমিকদের কেউ রেলব্রিজ ভাঙছেন। কেউ পুরাতন রেললাইন তুলছেন। আর এ কাজের তদারকি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্থানীয় লোকজন এসব কাজ দেখতে ভিড় জমিয়েছেন।

স্থানীয় শ্রমিক কুমারশাইল গ্রামের আতিকুর রহমান জানান, আমরা রূপসী বাংলা রেল নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০ জন শ্রমিক কাজ করছি।

ভারতীয় রেল কোম্পানি কালিন্দির শ্রমিক রাজু আহমদ জানান, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আমরা এখানে অবস্থান করছি। প্রথমে ঘাস কাটা ও খুঁটিনাটি কাজ করেছি। ১০০ জনের মতো শ্রমিক এখন ব্রিজ ভাঙা ও পুরাতন রেললাইন উঠানোর কাজ করছে। ইতোমধ্যে কাজ শুরুর খবর শুনে রেললাইনের দুই পাশের দখল করা জায়গার ওপর নির্মিত ঘরবাড়ি নিজ উদ্যোগে উঠিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। এ ছাড়াও রেললাইনের দুই পাশে উপকারভোগী সামাজিক বনায়নের নামে লাগানো গাছ স্ব-স্ব উদ্যোগে কেটে নেওয়া হয়েছে।

কালিন্দি রেল নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ জরিপকারক (সার্ভেয়ার) রিপন শেখ জানান, ইতোমধ্যে কাজের যন্ত্রপাতি পৌঁছে গেছে। দক্ষিণভাগ ও শাহবাজপুর এলাকায় মালামাল রাখা হয়েছে। এখন থেকে কাজ চলবে।’

রেলওয়ের কুলাউড়া সেকশনের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (কার্য) মো. জুয়েল হোসেন জানান, ‘এতদিন কাজ দৃশ্যমান ছিল না। আজ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পুনঃস্থাপন কাজের উদ্বোধনের পর পুরোদমে দৃশ্যমান হবে।

"