খুলনায় বন্ধুত্বের কোন্দলেই খুন হন শরিফুল

নেপথ্যে অর্থ ভাগাভাগি ও নারী কেলেঙ্কারি

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

খুলনা ব্যুরো

বন্ধুত্বের কোন্দলের জের ধরেই খুন করা হয়েছে নগরীর আড়ংঘাটাস্থ মহেশ^রপাশা উত্তর বণিকপাড়ার শ্রমিক নেতা মো. শরিফুল ইসলামকে। এর নেপথ্যে রয়েছে নারী কেলেঙ্কারি এবং চেক আটকে রেখে অর্থ আদায়ের ঘটনা। এসব বিষয়ে সৃষ্ট কোন্দলই পরবর্তীতে বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরে। তারই জের ধরে হুমায়ুন শেখ ওরফে হুমার নেতৃত্বে একটি অংশ নিজেদের পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতেই হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় শরিফুলকে। সরেজমিনে অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

১৫ আগস্ট রাতে নগরীর আড়ংঘাটাস্থ খানাবাড়ী এলাকায় একটি চায়ের দোকানে শরিফুলকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এ সময় স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আরিফ হোসেন ও চা-দোকানি রাশিদা বেগমও আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক ঢাকায় পাঠানো পরামর্শ দেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ আগস্ট ভোর রাতে মারা যান তিনি। তিনি স্থানীয় বণিকপাড়ার শেখ শামসুর রহমানের পুত্র।

শরিফুল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আড়ংঘাটা থানার এসআই মো. রাকিবুল হাসান বলেন, এজাহারভুক্ত আসামি সুন্দর রাজীবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। গত বুধবার শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। অন্য আসামিদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, নিহত এবং হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামিরা পরস্পর বন্ধু-বান্ধব। একটি অপরাধ সিন্ডিকেটের সঙ্গেও তারা জড়িত। তবে একটি ঘটনায় টাকার ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করেই মূলত তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই বিরোধের জের ধরেই শরিফুলকে হত্যা করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিহত শরিফুলের বন্ধু মনির, হুমায়ুন শেখ ওরফে হুমা এবং শেখ শরিফুজ্জামান নগরীর বয়রা ক্রস রোড এলাকার মশিউর রহমানের স্ত্রী শাহানা আক্তার (মৌ বিউটি পার্লার ও বুটিকস হাউসের মালিক) ও জাব্দিপুর নিকেরিপাড়ার বাবুর স্ত্রী লাকি বেগমকে দিয়ে বিভিন্ন সময় লোকজনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করে। তারই অংশ হিসেবে শাহানা আক্তারকে দিয়ে নগরীর দৌলতপুরস্থ মহেশ্বরপাশা এলাকার মৃত আবদুস সামাদ শেখের পুত্র ঘের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানকে ফোন করিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হলে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বান্ধবীর জন্মদিনের কথা বলে মিজানকে নগরীর খানজাহান আলী থানার বাদামতলা ও জাব্দিপুর নিকেরিপাড়াস্থ জাকিরের বাড়ির ভাড়াটিয়া ও প্রতারক চক্রের অপর সদস্য লাকি বেগমের বাসায় নিয়ে যায়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সে ঘরের মধ্যে থাকাকালে চক্রের সদস্য মনা, মনির, ইউসুফ ও শেখ শরিফুজ্জামানসহ কয়েকজন ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে। এ সময় শাহানা বিবস্ত্র হয়ে মিজানকে জড়িয়ে ধরে, আর তাদের সহযোগীরা নগ্ন দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করতে থাকে। এ ঘটনার পর তারা নগ্ন ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মিজানের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এ সময় তিনি এত টাকা না থাকায় ২০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। তখন চক্রটি তাদের সদস্য রাজীব এবং সম্প্রতি নিহত শরিফকে তার সঙ্গে পাঠায়। তারা মিজানের সঙ্গে তার বাসায় গিয়ে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং বাকি টাকার জন্য কৃষি ব্যাংক দৌলতপুর শাখার সিসি-২৩২’র স্বাক্ষরিত ৪টি ব্ল্যাংক চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে ছেড়ে দেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় তারা মিজানের কাছ থেকে মোট ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকা চাঁদা গ্রহণ করে। কিন্তু ৩টি চেক ফেরত দিলেও একটি রেখে দেয়।

এদিকে, ব্যবসায়ী মিজানকে ৩টি চেক ফেরত দিলেও একটি রেখে দেওয়া নিয়ে প্রতারকচক্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। খুন হওয়া শরিফুলের নেতৃত্বে মনা, মনির ও ইউসুফ চেক ফেরত দেওয়ার পক্ষে থাকলেও হুমায়ুন ওরফে হুমার নেতৃত্বে শরিফুজ্জামান ও রাজীবসহ অন্যরা বিরোধিতা করে। পরবর্তীতে গত ১ জুলাই শরিফুজ্জামান ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা লিখে চেক ডিজ-অনার করে মিজানকে লিগ্যাল নোটিস দেয়। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বাদী হয়ে ২৬ জুলাই খুলনা মহানগর দ্রুত বিচার আদালতে প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় মনির, শরিফ, মনা, রাজিব, ইউসুফ, হুমায়ুন শেখ, শাহানা আক্তার, লাকি বেগম ও শেখ শরিফুজ্জামানকে আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে খানজাহান আলী থানার এসআই মো. আবু হাসান সরেজমিনে তদন্তপূর্বক ঘটনার সত্যতা পান। তিনি গত ১২ আগস্ট এ-সংক্রান্ত আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

অপরদিকে, চেক নিয়ে বিরোধের জের ধরে বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটলের অংশ হিসেবে প্রতিপক্ষ হুমায়ুন ওরফে হুমার নেতৃত্বে অপর পক্ষের মনাকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মনা বাদী হয়ে হুমায়ুন ওরফে হুমাসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে খানজাহান আলী থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনার জের ধরে মনার নেতৃত্বে ৭ জুলাই হুমায়ুন ওরফে হুমাকে মারধর করে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় হুমায়ুন কবির হুমা বাদী হয়ে নিহত শরিফুল ইসলাম ও মনাসহ ৮ জনকে আসামি করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে ‘ঘ’ অঞ্চলে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দৌলতপুর থানায় তদন্তনাধীন রয়েছে।

সূত্র জানান, সর্বশেষ উল্লিখিত বিরোধের জেরে গত ১৫ আগস্ট রাত ৯টায় খানাবাড়ী এলাকায় শুকুরের চায়ের দোকানে হুমা ও তার সহযোগীরা শরিফুলের ওপর হামলা চালায়। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ আগস্ট ভোর রাত পৌনে ৪টায় সে মারা যায়। এ ঘটনায় নিহতের পিতা শামসুর রহমান বাদী হয়ে আড়ংঘাটা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় শরিফুলের বন্ধু হুমায়ুন কবির ওরফে হুমা, রাজীব, আরমান ওরফে দিপু, হিরু ওরফে হীরা, শরিফুল ইসলাম, সোহাগ, মানিক, সুন্দর রাজীব, শরিফুজ্জামান ও আফজাল। এর মধ্যে শুধু সুন্দর রাজীবকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এদিকে, ৮ সেপ্টেম্বর নিহত শরিফুল ইসলামের স্ত্রী শিউলি বেগম স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত হুমায়ুন কবির ওরফে হুমা, আরমান, রাজিব, হিরু, মানিক, রুবেল, ইউসুফ, সুন্দর রাজিব ও আলকাজকে গ্রেফতারের দাবি জানান।

"