বদলে যাচ্ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম

সিডিএ’র নেতৃত্বে উন্নয়নযজ্ঞ

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বন্দর নগর চট্টগ্রাম। আর এ বদলে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করার জন্য সিডিএ বাস্তবায়ন করছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। আউটার রিং রোড প্রকল্পটির ৭৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ওয়াসা মোড় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ফ্লাইওভার) ও কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক কাম বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। দ্রুত এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। সব মিলিয়ে উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান হবে এসব উন্নয়ন প্রকল্পগুলো।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ শেষ হবে, যা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এবং চলমান রয়েছে। বিশাল সম্ভাবনার ইকোনমিক জোন, শিল্পপার্ক, ডিপসি পোর্ট, বিদ্যুৎ পল্লী, পর্যটন শিল্প, এশিয়ান হাইওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে দক্ষিণ চট্টগ্রামে। এ কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করতে নগরীর লালখানবাজার থেকে শাহআমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত সাড়ে ১৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে।

১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ৯টি পয়েন্টে ১২ কিলোমিটারসহ ২৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। চার লেনের এই প্রকল্পের প্রস্থ ৬০ ফুট। নির্মিতব্য ফ্লাইওভারটি দক্ষিণ চট্টগ্রামকে বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পণ্যসামগ্রী শাহ আমানত সেতু থেকে শুরু করে মুরাদপুর ফ্লাইওভার হয়ে বন্দরে পৌঁছতে পারবে। ইপিজেড এবং কেইপিজেডের যানজট নিরসন করে নগরীর যান চলাচলের ক্ষেত্রেও ফ্লাইওভারটি ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

এদিকে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানি নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এবারের বর্ষায় তা অস্বাভাবিক মাত্রায় রূপ নেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন; শীর্ষক ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ শুরু হয়েছে। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

অন্যদিকে কর্ণফুলী তীরবর্তী কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার সড়ক কাম বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সিডিএ’র নেয়া এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হবে ২০২০ সালের জুন নাগাদ। প্রকল্পের আওতায় নদীর ভেতরের অংশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঢালু করে বক বসানো হবে। আর চার লেনের এই রোডটির সঙ্গে খাজা রোড, কে বি আমান আলী রোড ও মিয়াখান রোড যুক্ত হবে।

কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত এই সড়ক বাঁধটি নির্মাণ হলে নগরীর একাংশের জলজট ও যানজট নিরসন হবে। সেই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে আসবে আমূল পরিবর্তন। ঢাকা ও কক্সবাজারগামী যানবাহন নগরীতে প্রবেশ ছাড়াই এ সড়ক ব্যবহার করে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছবে। পাশাপাশি এ সড়ক প্রকল্পের কারণে দীর্ঘদিনের অবহেলিত এ এলাকা পর্যটন স্পটে পরিণত হবে। এরই মধ্যে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার, কদমতলী ফ্লাইওভার, দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার ও আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছে সিডিএ। এসব ফ্লাইওভারের কারণে চট্টগ্রাম নগরে যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে সহজতর হয়েছে।

এদিকে সিডিএ’র নির্মাণাধীন বড় প্রকল্প সিটি আউটার রিং রোডের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়ে এসেছে। আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৪ লেনের ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নির্মাণাধীন সিটি আউটার রিং রোডটি জনসাধারণের চলাচলের জন্য আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে খুলে দেয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কের সীতাকুন্ড অংশ থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এলাকা পর্যন্ত চলাচলরত কার্গো পরিবহনের জট কমাতে এটি একটি বিকল্প যোগাযোগ সড়ক এবং উপকূলীয় এলাকাকে জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

সিডিএ’র প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, এই সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প সামুদ্রিক জোয়ারের পানি থেকে হালিশহর, পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করবে। শক্তিশালী ঢেউ মোকাবিলা করার জন্য থাকছে এতে সুরক্ষিত প্রাচীর। রিং রোডটি চালু হলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহে যানজট নিরসন হবে। পাশাপাশি, চটগ্রাম বন্দর থেকে মালবাহী ভারী পরিবহনগুলো সহজ ভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। প্রকল্পটির প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

এসব বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানে চট্টগ্রামের উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। গত ৯ বছরে বিরামহীন, বিশ্রামহীন কাজ করেছি। সব কিছু বাদ দিয়ে চেষ্টা করেছি, চট্টগ্রামবাসীকে একটা নতুন চট্টগ্রাম উপহার দেওয়ার জন্য। কতটুকু পেরেছি, কতটুকু পারিনিÑ সেটা বিচারের ভার প্রিয় চট্টগ্রামবাসীর ওপর ছেড়ে দিলাম।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প, লিংক রোড প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প, বাইপাস রোড প্রকল্প, চাক্তাই খালের মুখ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ প্রকল্প বিশাল, বিশাল কাজ। চট্টগ্রামের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। তবেই শুরু হওয়া প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখে দেবে। এসব প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হলে চট্টগ্রামের সর্বনাশ হয়ে যাবে।

আবদুচ ছালাম বলেন, বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম, বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম, জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম, যানজটমুক্ত চট্টগ্রাম, বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র চট্টগ্রামÑ এই স্বপ্নগুলো, আকাক্সক্ষাগুলো চট্টগ্রামবাসীর। চট্টগ্রামের মানুষের স্বপ্নকে আমি ধারণ করেই আমার পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ৫০ বছর এগিয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা ইনশাআল্লাহ পূরণ হবে, যদি আমরা যে প্রকল্প শুরু করেছি, সেটা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা যায়।

তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্প বিশাল বিশাল কাজ একদিনে, একমাসে বা ২০১৮ সালে শেষ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। শেষ করতে হলে আগামীতে যে সরকার আসবে সেই সরকারের ওপর নির্ভর করবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কিনা। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

"