নতুন সড়ক অবকাঠামোয় বদলে যাবে বাংলাদেশ

পদ্মা সেতু মেট্রোরেল এক্সপ্রেসওয়েতে গতি

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০, সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা-২০৪১ এবং রূপকল্প-২০২১, সামনে রেখে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো ‘উন্নয়ন মহাসড়কে’ উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সড়ক খাতের উন্নয়নে ২৫৪টি প্রকল্পের কাজ শেষ করেছে। একই সময়ে হাতে নিয়েছে ২৮১টি নতুন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মধ্যে আছে দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতুসহ এক্সপ্রেসওয়ে, চার লেন, ছয় লেন সড়ক।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৫৭ শতাংশ। প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে এই প্রকল্পে। এ পর্যন্ত পাঁচটি স্প্যান বসানো হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে শরীয়তপুরের জাজিরা পর্যন্ত ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার সেতুটি নির্মাণের কাজ শেষ হলে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

এ ছাড়া ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদপুরের ভাঙা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের ভৌত কাজ চলছে। যাত্রাবাড়ী ইন্টারসেকশন থেকে ইকুরিয়া-বাবু বাজার সংযোগ সড়কসহ মাওয়া পর্যন্ত এবং পাঁচ্চর থেকে ভাঙা পর্যন্ত হবে এ এক্সপ্রেসওয়ে। প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর সঙ্গে যোগ হবে। এটি চালু হবে ২০১৯ সালের এপ্রিলে। এই এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে যাত্রাবাড়ী থেকে ফরিদপুরের ভাঙা যেতে সময় লাগবে ৪২ মিনিট। রাজধানীতে মাথার ওপর দিয়ে ছুটে চলবে মেট্রো রেল। মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত মেট্রো রেল স্থাপনের প্রকল্পে খরচ হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত এই রেলব্যবস্থা চালু হবে। আগামী বছরের ডিসেম্বরে অংশে মেট্রো রেল চলবে। এখন আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, মিরপুর-১২, উত্তরার দিয়াবাড়ীতে প্রকল্পের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে।

ঢাকার যানজট নিরসনে হাতে নেওয়া এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির কাজ চলছে। রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের পাশে রেলপথ ঘেঁষে প্রকল্প এলাকা। বাংলাদেশ সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বিমানবন্দর থেকে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর ও সায়েদাবাদ হয়ে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পর্যন্ত যাবে এটি। এতে ওঠা-নামার র‌্যাম্প থাকবে ৩১টি। এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে। বিনিয়োগ করছে ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। বাংলাদেশ সেতু বিভাগের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সেতু বিভাগ ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (উড়াল সড়ক) প্রকল্প পিপিপিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগও নিয়েছে। ঢাকার বিমানবন্দর সড়ক থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এ এক্সপ্রেসওয়ে। এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করা হয়েছে। এই চার লেন মহাসড়কের পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে। এ ছাড়া জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কও চার লেন করা হয়েছে। জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা মহাসড়কও চার লেন করা হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ৯৩১ কিলোমিটার মহাসড়ক মজবুত করা হয়েছে। প্রায় চার হাজার ৫৯২ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। কার্পেটিং ও সিলকোট করা হয়েছে চার হাজার ৪৫১ কিলোমিটার মহাসড়ক। এক হাজার ৮১৩ কিলোমিটার ডিবিএসটি ও ছয় হাজার ৯২৫ কিলোমিটার সড়ক ওভারলে করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৮৪২টি সেতু। ৩৫৪৬টি কালভার্ট নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৭১ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ৯১ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার লেন ছিল। বর্তমান সরকার সাড়ে আট বছরের মাথায় ৩৭৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার লেন বা তারও বেশি লেনে উন্নীত করেছে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে প্রথমবারের মতো ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা রেখে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড় থেকে নাটোরের বনপাড়া মোড় পর্যন্ত ৫১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আদর্শ মানের জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ করেছিল। উভয় পাশে এক স্তর নিচু আলাদা সার্ভিস লেনের সংস্থান রেখে জাতীয় মহাসড়কগুলোকে চার লেনে উন্নীত করার জন্য প্রথম পর্যায়ে এক হাজার ৭৫২ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা করা হয়েছে।

বর্তমান সরকারের সময়েই শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু (তৃতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু), শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু, সুলতানা কামাল সেতু, হজরত শাহ আমানত (রহ.) সেতু, আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু, চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগ উড়াল সেতু, তিস্তা সেতু, রুমা সেতু, সিলেটে কাজীর বাজার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। বনানী লেভেলক্রসিংয়ে ৩৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০৪ মিটার দীর্ঘ রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর এটি চালু করা হয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা মহানগরের উত্তরা, গাবতলী ও আশুলিয়া পয়েন্টে যানজট কমাতে সাড়ে ১০ কিলোমিটার বিরুলিয়া-আশুলিয়া মহাসড়ক এবং এ মহাসড়কে তুরাগ নদের ওপর প্রায় ১৮৬ মিটার দীর্ঘ বিরুলিয়া সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এটি চালু করা হয়েছে ২০১৫ সালে।

পটুয়াখালীর কুয়াকাটার সঙ্গে সারা দেশের মহাসড়ক যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন করতে ১৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা আঞ্চলিক মহাসড়কের খেপুপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীর ওপর ৮৯৩ মিটার দীর্ঘ শহীদ শেখ কামাল সেতু, একই সড়কের হাজীপুর এলাকায় সোনাতলা নদীর ওপর প্রায় ৪৮৪ মিটার দীর্ঘ শহীদ শেখ জামাল সেতু, মহীপুর ও আলীপুরের মধ্যবর্তী খাপড়াভাঙা নদীর ওপর প্রায় ৪০৮ মিটার দীর্ঘ শহীদ শেখ রাসেল সেতু করা হয়েছে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর পর্যন্ত মহাসড়ক আট লেনে উন্নীত করা হয়ছে। এতে প্রায় ১২৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট এটি উদ্বোধন করা হয়।

সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ৬৫৪টি মহাসড়ক সমন্বয়ে ১৩ হাজার ২৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ জেলা মহাসড়ক নেটওয়ার্ক আছে। প্রায় এক হাজার ৬৩ কোটি টাকার ব্যয়ে ১৭৩টি জেলা মহাসড়কের এক হাজার ৬৯৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।

 

"