সিপিডির বার্ষিক সংলাপ

অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখতে জ্বালানি ও পরিবেশে জোর দিতে হবে

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতি ধরে রাখা এবং আরো উন্নতির জন্য খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবেশের প্রতি জোর দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমলেও পুষ্টিহীনতা আশানুরূপভাবে কমেনি। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন। জনবহুল এই দেশের সবার জন্য পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে হলে কৃষিতে রাসায়নিক, কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়াতে হবে। দেশে জ্বালানি ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান জ্বালানি ব্যয়ও বেশি। জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। তাই সে অনুযায়ী, সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় যাওয়া উচিত। আর বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিতে হবে। এই কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারলে বৈষম্য কমে আসবে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বার্ষিক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মালয়েশিয়ার অধ্যাপক জুমো কেম সুন্দরম এসব কথা বলেন। তার বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে খাদ্য, জ্বালানি ও বৈষম্যের চ্যালেঞ্জ।’

অধ্যাপক জুমো মালয়েশিয়ার ‘কাউন্সিল অব এমিনেন্ট পারসন’ এর সদস্য। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো এবং মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অস্থায়ী অধ্যাপক। বৈশ্বিক অর্থনীতি, সামাজিক উন্নয়ন, খাদ্য ও কৃষিখাত নিয়ে অধ্যাপক জুমোর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা রয়েছে।

রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গতকাল শনিবার স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অধ্যাপক জুমোর পরিচিতি তুলে ধরেন সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, গবেষক, আইনজীবী, বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। অনেকে প্রধান বক্তাকে প্রশ্নও করেন।

প্রায় এক ঘণ্টার বক্তৃতায় জুমো বৈশ্বিক অর্থনীতির রূপান্তর, আঞ্চলিক অর্থনীতির গুরুত্ব, বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রণমূলক (প্রটেকশনিজম) উদ্যোগ, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য, অর্থ পাচার এবং বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির দেশগুলোর করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দরকার। কিন্তু সেক্ষেত্রে পরিবেশগত ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। উন্নয়নের জন্য শিল্পায়ন দরকার। আর শিল্পায়নের জন্য বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সমন্বয় জরুরি। দরকার প্রয়োজনীয় জ্বালানির। মানব উন্নয়নের সঙ্গে উৎপাদনশীলতা ও জীবনধারা সম্পৃক্ত। তবে পুষ্টিহীনতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে চিহ্নিত হয়নি এমন অনেক দরিদ্র (হিডেন হাঙ্গার) মানুষ আছে। আবার এসব দেশের খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন কারণে স্থূলতাও বাড়ছে। রক্ত স্বল্পতা, ভিটামিন এ’র ঘাটতির মতো সমস্যা কমলেও শেষ হয়নি। এসব কারণে কর্মক্ষমতা কমছে মানুষের। বাংলাদেশে এ ধরনের অপুষ্টিজনিত সমস্যা বাড়ছে। অপুষ্টিজনিত সমস্যা যে হারে কমার কথা সেই হারে কমছে না। বিশ্বের ৩০ ভাগ মানুষ স্থূলতা সমস্যায় ভুগছে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি অস্ত্র সংঘাত বা ধূমপানের ক্ষতির সমান। এদিকে, জলবায়ু পরিবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। কার্বন নির্গমন কমাতে না পারলে এ উষ্ণতা বাড়তেই থাকবে।

অধ্যাপক জুমো আরো বলেন, এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ এগোচ্ছে। ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে চাহিদা অনুযায়ী, সরবরাহ বাড়ছে না। এ জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির (ডিজেল) পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় সাশ্রয়ী। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপাদান রফতানিতে বর্তমানে মালয়েশিয়া শীর্ষে রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনাও কম নয়। এটি সম্ভব হলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পাশাপাশি রফতানিও করতে পারবে। এ জন্য বেসরকারি খাতকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে।

 

"