আ.লীগের নির্বাচনী অভিযাত্রা শুরু

* লক্ষ্য তৃণমূলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- পৌঁছানো * দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে তোলা * দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

এবার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নামল আওয়ামী লীগ। সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতা নিশ্চিত করতে গতকাল ট্রেনে চড়ে উত্তরাঞ্চলে এই ‘নির্বাচনী যাত্রা’ শুরু করে ক্ষমতাসীনরা। এই সফরের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক তিনটি কাজ করতে চায় দলটি। এগুলো হলো তৃণমূলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- পৌঁছে দিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে জনমত তৈরি করা, ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে নামতে তৃণমূলে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে তোলা ও নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান নিতে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন।

এই নির্বাচনী ট্রেন অভিযাত্রায় ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দুঃশাসন ও দুর্নীতি, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলাসহ বিএনপি-জামায়াতের বিভিন্ন অপকর্মের তথ্যও তুলে ধরবেন দলের নেতারা।

আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দলের নির্বাচনী প্রচারণা যেমন হবে তেমনি দেশজুড়ে নির্বাচনী আবহ তৈরি হবে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও প্রচারণায় নামতে উৎসাহবোধ করবে। বিশেষ করে এবার নির্বাচন যেসব দলের অংশগ্রহণে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে, সে বার্তাও পাবে মানুষ। মানুষের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের উৎসাহ দেখা দেবে।

গতকাল শনিবার সকালে আওয়ামী লীগ নেতাদের উত্তরাঞ্চলে ট্রেন সফর করার আগে কমলাপুর স্টেশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে সফর নিয়ে কথা বলেন সফরের নেতৃত্ব দেওয়া সেতুমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। সেজন্য প্রস্তুতি সেভাবেই নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা থাকলে তা নিরসন করা হবে। আমাদের এই যাত্রা তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কাজ তৃণমূলে পৌঁছে দিতে এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতেই এই সফর করা হচ্ছে। এমনকি তৃণমূলের মানুষ যাতে বিএনপি-জামায়াতের গুজবের রাজনীতির ব্যাপারে সচেতন হতে পারে ও ক্ষমতায় থাকতে বিএনপির দুর্নীতি-দুঃশাসন সম্পর্কে জানতে পারে সে বিষয়ে দলের এই সাংগঠনিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। সে হিসাবে ডিসেম্বরের শেষের দিকে নির্বাচন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকারও। এরই মধ্যে উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী ট্রেন অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে আরো গতি পেল দেশের নির্বাচনী রাজনীতি। নির্বাচনী প্রচারণায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তুলনায় আরো এক ধাপ এগিয়ে রইল ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রের তথ্য মতে, আগামী ৩১ অক্টোবর অথবা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে পারে নির্বাচন কমিশন। এই তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচনী প্রস্তুতি সেরে রাখতে চায় দল। এরই অংশ হিসেবে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্বাচনী প্রস্তুতির যেসব কার্যক্রম রয়েছে, তার ৮০ শতাংশই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে শেষ করবে ক্ষমতাসীন দলটি।

ক্ষমতাসীন দলের সূত্রগুলো জানায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থাকবেন। ওইসময় তার পক্ষে দলীয় কাজে কিছুটা সীমাবদ্ধতা দেখা দেবে। এছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারে মন্ত্রী হিসেবে যারা থাকবেন তাদেরও কাজের সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাই তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচনী কাজ গুছিয়ে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে এই ট্রেন অভিযাত্রা শুরু হলো। নির্বাচনের আগে পর্যন্ত দেশজুড়ে এই অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে। এই ট্রেন যাত্রার মধ্য দিয়ে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে নির্বাচনী সফর করবে আওয়ামী লীগ। সফরকালীন বিভিন্ন স্টেশনে ১১টিরও বেশি পথসভা করার কথা রয়েছে। এর পর আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর লঞ্চযোগে নির্বাচনী সফর করবে। এরপর সড়কপথে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ যাওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে রাজশাহীতেও নির্বাচনী সফর করেছে দলটি।

এর আগে গত ৩০ জুন গণভবনে দলের এক বর্ধিত সভায় প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ঘরে ঘরে গিয়ে সরকারের উন্নয়নের কথা তুলে ধরতে দলের তৃণমূলের নেতাদের নির্দেশ দেন। সেখানে তিনি দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও নির্দেশ দেন। জনসমর্থন বাড়ানোর ওপর জোর দেন। যেখানে যেখানে সমস্যা আছে তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলারও তাগিদ দেন তিনি। ফলে এবারের সফরে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী তৃণমূলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- পৌঁছে দেওয়া, নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করা ও দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করবেন নেতারা।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে সারা দেশে একাধিক জনসভা করবে ক্ষমতাসীনরা। সেখানে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখবেন। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাও হবে সেপ্টেম্বরে। ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচন সংক্রান্ত কাজও ভাগ করে দেওয়া হবে। এসব জনসভার মাধ্যমে সারা দেশে নির্বাচনী আওয়াজ তোলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠে সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। এই দুই মাসে জেলা নেতাদের আরেকবার ঢাকায় ডেকে এনে নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেবেন শেখ হাসিনা। এ সময় নির্বাচনে কারা দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন তাদের সম্পর্কে ইঙ্গিতও দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে, তফসিল ঘোষণার পর পরই দলের চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা, যাতে প্রার্থিতা নিয়ে সময়ক্ষেপণ বা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহববু-উল আলম হানিফ বলেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নির্বাচন সংক্রান্ত সিংহভাগ কাজ শেষ করা হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় দলীয় কাজে তার অনেক সীমাবদ্ধতা থাকবে। তাই দুই মাসে প্রস্তুতি শেষ করা হবে।

এছাড়া আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ দলীয় জোটকে নিয়ে মাঠে নামবে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন বানচাল করে অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে পর্যন্ত মাঠে থাকার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সময় রাজধানীসহ সারা দেশে বিভাগীয় সমাবেশ করবে। এই সমাবেশ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

এ ব্যাপারে ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশে নির্বাচনী কর্মকা- শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে। দলও মাঠে নেমেছে। আমরা বলতে চাই, সংবিধানবিরোধী কোনো কাজ বাংলাদেশে হবে না। সংবিধানবিরোধী কোনো কাজ আমরা ১৪ দল মেনে নেব না। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনে ১৪ দল জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করবে। আমরা আন্তরিকভাবে চাই সব দল অংশগ্রহণ করুক। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের রায় মেনে নিক।

এর আগে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত মেয়র প্রার্থীর লক্ষাধিক ভোট প্রাপ্তিতে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, বিএনপি এত ভোট পায় কি করে? তোমরা কি বিএনপির অপকর্মের তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছ? ফলে এখন থেকে নির্বাচনকালীন সফরগুলোতে বিএনপির বিভিন্ন অপকর্ম তুলে ধরার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর জন্য লিফলেট তৈরি ও ভিডিও প্রচারণার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়।

এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটে জনসভা করে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর বিভিন্ন জেলায় সমাবেশ করে নৌকায় ভোট চান তিনি। পরে গত মার্চ থেকে জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণায় নামে আওয়ামী লীগ।

দলীয় সূত্র মতে, এসব সফরের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের আগে দলীয় শৃঙ্খলা ফেরাতে চায় আওয়ামী লীগ। এজন্য গত বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় নেতাকর্মীদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। নিজেদের মধ্যে সব ধরনের দ্বন্দ্ব ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। দলীয় নেতাদের কোনো ধরনের নেতিবাচক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়ার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। দলের বিপক্ষে কোনো নেতাকর্মী যেন কথা না বলেন সে বিষয়েও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে বা চিঠি দিয়ে তলব বা সাংগঠনিক সফর না করে কেন্দ্রীয় নেতাদের আকস্মিক সফরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় সভাপতি।

এ ব্যাপারে দলের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগের মূল শক্তি। তারা বরাবরই শেখ হাসিনার ওপর আস্থাশীল। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আয়োজিত বিশেষ বর্ধিতসভায় শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর থেকেই তৃণমূল নেতাকর্মীরা আরো চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে এই বর্ধিতসভা টনিক হিসেবে কাজ করবে।

 

"