‘একাত্তরের জননী’ রমা চৌধুরীর প্রয়াণ

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

চট্টগ্রাম ব্যুরো

‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থের লেখক ও মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার রমা চৌধুরী মারা গেছেন। গতকাল সোমবার ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। রমা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গিয়েছিল তার। সেই থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কয়েক দিন আগে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। গত রোববার রাত ১০টায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে তা খুলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। সকালে তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। রমা চৌধুলীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে শহীদ মিনারে। সেখানে সমবেত হন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সংবাদ কর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা। বিনম্র শ্রদ্ধায় রমা চৌধুরীকে শেষ বিদায় জানায় তার জন্মভূমি চট্টগ্রামের মানুষ। পরে বিকেল ৫টার দিকে বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে ছেলে দীপংকর টুনুর সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। রমা চৌধুরীর শেষ ইচ্ছা ছিল, তার মরদেহ দাহ না করে বুকে লাল-সবুজের পতাকা দিয়ে যেন সমাহিত করা হয়। সেই ইচ্ছা পূরণ হলো।

এদিকে, সোমবার মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা জননী রমা চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত রমা চৌধুরীর ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। শেখ হাসিনা তার বিদেহী আত্মার পরলৌকিক শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

দুপুর ১২টায় চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। এর আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান এবং ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, চট্টগ্রাম মহানগর কমান্ডার মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রমা চৌধুরীর মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

রমা চৌধুরীকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে শহীদ জায়া মুশতারী শফি বলেন, তার পুরো জীবনজুড়েই শুধু আত্মত্যাগ আর সংগ্রাম। জননী সাহসিকা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি অনেক বই রচনা করেছেন; অনেক লিখেছেন। সেসব লেখা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়নি। আমাদের উচিত তার স্মৃতিকে ধরে রাখা।

মায়ের মরদেহের কাছে দাঁড়িয়ে কান্নারত সন্তান জহর লাল চৌধুরী বলেন, আমার মা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। তাই একাত্তরে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমার মা চাপা অভিমান নিয়ে চলে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি অনেকের দ্বারে গিয়েছিলেন। কেউ তখন তাকে সহায়তা করেনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমার মায়ের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হোক।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান বলেন, রমা চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। এই রাষ্ট্র, এই জাতির প্রতি তার অপরিসীম ত্যাগ। এই মহিয়সী নারীর মৃত্যুতে গোটা জাতি শোকাহত। চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, রমা চৌধুরী একজন বীর। তিনি আমাদের লাল-সবুজের পতাকা এনে দিয়েছেন। আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি রমা চৌধুরীর মতো অসংখ্য বীরের আত্মত্যাগের জন্য। রমা চৌধুরী আজীবন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। কারণ, বীরের কখনো মৃত্যু হয় না।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম, উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন, কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিনও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রমা চৌধুরীর মরদেহ নেওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত চেরাগি পাহাড় মোড়ে লুসাই ভবনের নিচে। সেখানে আরেক দফা শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নেওয়া হয় বোয়ালখালীর পোপাদিয়ায় গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই তার ছেলের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে- তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রিধারী। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রমা চৌধুরী ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। চার ছেলে সাগর, টগর, জহর এবং দীপংকরকে নিয়ে ছিল তার সংসার। কিন্তু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর গুলিতে দুই পুত্র নিহত ছাড়াও দৈহিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার ঘরবাড়ি। তবু জীবনযুদ্ধে হার মানেননি এ বীরাঙ্গনা। শুরু করেন নতুনভাবে পথচলা। ২০ বছর ধরে লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন রমা চৌধুরী। যদিও তার লেখ্যবৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত ও স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানির বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তার জীবন-জীবিকা। পরে লিখে ফেলেন একে একে ১৮টি বই। এসব বই বিক্রি করেই চলত তার সংসার।

কোমরের আঘাত, গলব্লাডার স্টোন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি রমা চৌধুরী ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

"