ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাঙালির ঠিকানা

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

এক দিন স্বাধীনতা আদায়ে উত্তাল মানুষের শেষ ঠিকানাই ছিল ধানমন্ডির ছিমছাম দ্বিতল বাড়িটি। এ পথ সে পথ ঘুরে প্রতিদিনই মিছিল এসে থামত বাড়িটির সামনে, উঠোনে, আশপাশে। স্লোগান দিত। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন বঙ্গবন্ধু। পেছনে হাসিমুখ স্ত্রী ফজিলাতুননেছা। এখনো মিছিল আসে। মিছিল যায়। মানুষ আসে। স্লোগান দেয়। কেবল হাত তোলেন না তিনি, দাঁড়ান না বারান্দায়, চোখের আলোয় দেন না ছড়িয়ে আগুনের হলকা। মানুষ তবু আসে। দাঁড়িয়ে থাকে। নীরবে ফেলে চোখের জল। ভেতরে জ্বলতে থাকা আগুনে, ভালোবাসায়-শ্রদ্ধায় শপথ নেন, তার স্বপ্নের দেশ গড়তে।

পঁচাত্তরের আগস্টের এক রাতে এই বাড়িতেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে। সেই থেকে শোকের আগুনে জ্বলা বাঙালির কাছে বাড়িটি হয়ে ওঠে সত্য ও সুন্দর, দ্রোহ ও শপথের পীঠস্থান। দূর কিংবা কাছে থেকে, দৃশ্য বা অদৃশ্যে, মানুষ স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকে, তার স্বজনদের। প্রতিদিনই ফুলে ফুলে শোভিত থাকে তার প্রতিকৃতি। অপলক চোখে তুলে প্রজন্ম পরম্পরায় মানুষ দেখে তার স্বাধীনতার জনককে, স্বাধীন বাংলার স্থপতিকে। শ্রদ্ধায় অবনত হয় মাথা। ভেবে সে কালরাতের কথা, যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে আসে শরীর। ঘৃণায় থু থু ছিটান নরপশুদের নামে। হাঁটুমুড়ে বসে, কখনো কেউ কাঁদেন ডুকরে।

মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা শৈশব-কৈশোর থেকেই। খেলতে খেলতে, বন্ধুদের সাহচর্যে কিংবা দুরন্তপনা এক দিন তাকে কাছে নেয় মানুষের। বন্ধু, স্বজন কিংবা দলের লোকদের জন্য মন কাঁদত সব সময়। রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই প্রকাশ পায় রাজনীতির অসীম প্রজ্ঞার। কংগ্রেসের ঘোরবিরোধিতার মুখেও এড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সব সম্ভাবনা, স্কুলপড়–য়া বঙ্গবন্ধুর নিঁখুত নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই গোপালগঞ্জ সফর করে যান শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী। অতটুকুন বয়সেই মেধা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা, বঙ্গবন্ধুকে কাছে নেয় দুই বাংলার এই দুই কালজয়ী নেতার।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই হাতেখড়ি হয় রাজনীতির। স্পষ্ট হয় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার দর্শন। বন্ধু আবদুল মালেককে যেদিন ধরে নিয়ে যায় হিন্দুমহাসভার লোকজন, খেলার মাঠ থেকে ফিরে দলবল নিয়ে সে বাড়িতে হানা দেন বঙ্গবন্ধু। পুলিশের সামনে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, ছেড়ে না দিলে কেড়ে নেওয়ার। সে নিয়ে হতে যাওয়া হিন্দু মুসলমানের হানাহানি, বন্ধ করেন অসীম বিচক্ষণতায়। সে থেকেই কিশোর বঙ্গবন্ধু বনে যান গোপালগঞ্জের এক অঘোষিত খুদে নেতা।

রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে ১৯৩৯ সালে, নবম শ্রেণিতে। এক দিন কলকাতা বেড়াতে যান। দেখা করেন সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে। সরাসরি প্রস্তাব করেন গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠনের। মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি হলেন খন্দকার শামসুদ্দীন আহমেদ ও বঙ্গবন্ধু সম্পাদক। গঠন হলো মুসলিম লীগও। সম্পাদক হলেন এক মোক্তার সাহেব। কিন্তু কাজ করতেন বঙ্গবন্ধুই। একটা মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটিও গঠন করা হলো। তার সম্পাদক হলেন বঙ্গবন্ধু। এভাবেই ধীরে ধীরে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করলেন মানুষের রাজনীতিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাধা দিলেন না বাবা। কেবল ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন, ‘লেখাপড়ার দিকে নজর দেবে।’

"