লক্ষ্য জাতীয় নির্বাচন

আবারও আলোচনায় জোট রাজনীতি

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি মাত্র সাড়ে চার মাস। সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারো আলোচনায় জোট রাজনীতি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও দলের বাইরে নতুন করে জোট গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব জোটের মূল লক্ষ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই জোটের মধ্য দিয়ে দলগুলো যেমন নির্বাচনে আসন পেতে দর কষাকষির পথ তৈরি করতে চায়; তেমনি ক্ষমতার অংশীদারও হতে চায় তারা। কোনো কোনো জোটের লক্ষ্য আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক বলয় তৈরি করা। তবে মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্যই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে থেকে সরকার গঠন এবং ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ।

ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, এই জোট রাজনীতি ততই নতুন মেরুকরণ পাচ্ছে। দৃশ্যমান হচ্ছে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ, জোট গঠনের চেষ্টা, জোট ও দল ভাঙা-গড়া এবং ছোট জোট নিয়ে বড় জোটের নানা কৌশলের খেলা। একদলের সঙ্গে আরেক দল বা দলের সঙ্গে অন্য জোটের নির্বাচনী সমঝোতার কথাও শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সম্প্রসারণের আলোচনা যেমন উঠছে; আবার ২০ দলীয় জোট ভাঙনের আশঙ্কা ও পরিসর বৃদ্ধির কথাও শোনা যাচ্ছে। জাতীয় পার্টির জোট গঠনের খবর মাঝে মধ্যেই সরব করে তুলছে রাজনীতি। বাম দলগুলো এরই মধ্যে মোর্চা করেছে। ইসলামী দলগুলো বারবার ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। এসবের বিপরীতে দল ভাঙার ঘটনাও ঘটছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের মধ্যে নিবন্ধন নেই ১২ দলের। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল চারটি। এসব জোটবদ্ধ দলের কতগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা রাখে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আসলে এসব দল চেষ্টা করছে জোটের কাঁধে ভর করে রাজনীতি করার। অন্যদিকে জোট ভারি করে রাজনীতি করছে বড় দলগুলো। জোটের আকার যত বড় হবে প্রতিপক্ষকে তত বেশি চাপে ফেলারও সুযোগ হবেÑ এমন ধারণা থেকেই মূলত জোট গঠনের প্রতিযোগিতা হচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আগামী নির্বাচন কেমন হবে, তার ওপর নির্ভর করছে এসব দল-জোটের ভবিষ্যৎ। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে এসব নামসর্বস্ব দল ও জোটের নেতারা গুরুত্ব পাবেন। তবে এসব জোট ও দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা যায় না।

বিশেষ করে গত জুলাই থেকে আবারো জোট গঠনের নানা তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত তিন দিনে এমন তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পার্টির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা হয় খেলাফত মজলিসের। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এইচ এম এরশাদ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে ছয় দফা চুক্তির ভিত্তিতে নির্বাচনী সমঝোতা করেন। ওই অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেন, খেলাফত মজলিস একটি অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল। তারা আমাদের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য করায় খুব খুশি হয়েছি। এর আগে গত বছর মে মাসে ইসলামী মহাজোটের চেয়ারম্যান আবু নাছের ওয়াহেদ ফারুক ৩৪টি ইসলামী দল নিয়ে জোট গঠন করে এরশাদের সঙ্গে ইসলামী মহাজোট করেন। বর্তমানে এরশাদের নেতৃত্বে ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোট রয়েছে। খেলাফত মজলিসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সম্মিলিত জাতীয় জোটে জাতীয় পার্টিসহ মোট দলের সংখ্যা দাঁড়াল ৬০। যদিও এই জোটের মাত্র তিনটি দলের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রয়েছে। বাকিগুলো নামসর্বস্ব। এই নিয়ে বেশ হাস্যরস দেখা দেয় রাজনীতিতে। পরে অবশ্য গঠনের চার মাসের মাথায় সে জোট থেকে বেরিয়ে আসে ২১টি ইসলামী দলের জোট জাতীয় ইসলামী মহাজোট।

গতকালের অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেন, জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। কিন্তু এর আগে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিএনপি এলে জাতীয় পার্টি আগের মতো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে ভিড়বে, আর বিএনপি না এলে আলাদাভাবে নির্বাচন করবে।

তবে জোট রাজনীতিতে এই মুহূর্তে বেশি আলোচনায় গণফ্রন্ট সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এই জোটে বিএনপি থাকলেও জোটের নেতৃত্ব বিএনপির হাতে থাকছে না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠনের লক্ষ্যেই সুশীল সামজের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতায় এই জোট গঠনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই জোটের নেতৃত্ব ড. কামাল হোসেন অথবা বিকল্পধারা সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা চলছে।

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, গত বুধবার মার্কিন দূতাবাসের দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের দীর্ঘ বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি সর্বদলীয় প্লাটফর্ম গঠনের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। এমনকি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন জোটের শরিকদের অন্তত ১৫০ আসন ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারেও আলোচনা হচ্ছে। তবে জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এরই মধ্যে বিএনপির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপির মূল অংশটি চাচ্ছে দলের হাতে জোটের নেতৃত্ব।

অবশ্য বিএনপি জোট সম্প্রসারণের কথা বলছে গত জুলাই থেকেই। তখন থেকেই বিএনপির নেতৃত্বে ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য’ গড়ার কথা শোনা যাচ্ছে। দলীয় সূত্র মতে, ২০ দলীয় জোটের বাইরের পাঁচটি দলকে নিয়ে শিগগির ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য’ গড়তে যাচ্ছে বিএনপি। দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। ঈদুল আজহার পর আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে পৃথক মঞ্চ থেকে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে তারা। বৃহত্তর এই জোটে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য থাকার কথা। তবে এখন পর্যন্ত এই জোট গঠনের ব্যাপারে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ আবারও বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাদ দিয়ে একটি একদলীয় নির্বাচনের ষড়যন্ত্র করছে। তাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন কায়েম করতে জাতীয় ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তারা আশা করছেন, শিগগির বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়া সম্ভব হবে।

নির্বাচনী জোট নিয়ে তৎপর আওয়ামী লীগও। গত জুলাই থেকেই ১৪ দলীয় জোটের বাইরে অন্য কয়েকটি দলকে লক্ষ্য করে দলের মধ্যে এ ধরনের তৎপরতা কথা শোনা যাচ্ছে। দলীয় সূত্র মতে, তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আবার কয়েকটি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করতে নিজেরাই আগ্রহ দেখায়। সব মিলে নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের পরিধি বাড়াতে চাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। তবে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, ১৪ দলীয় জোটের পরিধি বাড়ানো হবে না। শুধু নির্বাচনী জোট গঠন করা হবে। সে লক্ষ্যে দল কাজ করছে। এসব করা হচ্ছে বিএনপির নির্বাচনে আসা না আসার বিষয়টি মাথায় রেখে। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে এসব দল যেন নির্বাচনে অংশ নেয় সেটা এখন থেকেই নিশ্চিত করতে চায় আওয়ামী লীগ। আবার বিএনপি নির্বাচনে এলে অন্য দলগুলো যেন তাদের সঙ্গে না যেতে পারে সেজন্য আগেভাগেই নির্বাচনী জোট গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের তৎপরতা স্বাভাবিক বিষয়। তবে স্বাধীনতার পক্ষের ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনে যারা বিশ্বাসী তাদের সঙ্গে জোট হতে পারে। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি আসবে না সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো চিন্তা নেই। কারণ বিএনপি নির্বাচনে এলেও অংশগ্রহণমূলক হবে, না এলেও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।

এর আগে গত ১৮ জুলাই বুধবার ‘অপরাজনীতির বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি জোরদার করা’র উদ্দেশ্যে আটটি বাম দলের সমন্বয়ে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ নামে নতুন একটি জোট আত্মপ্রকাশ করে। জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলো হলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। সেদিন রাজধানীতে জোটের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জানান, প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে তাদের এ জোট। পরে অবশ্য এ জোটের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

"