নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ সমাধান

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে টানা আট দিন রাস্তায় অবস্থানের পর গত সোমবার ক্লাসে ফিরেছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকার পদক্ষেপ নেওয়ায় ঢাকার শীর্ষস্থানীয় সব স্কুল-কলেজসহ ৪২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে ক্লাসে ফিরে যান। বিশেষ করে সেদিন সরকারের মন্ত্রিসভায় সড়ক পরিবহন আইন অনুমোদন পাওয়ায় স্বস্তি ফেরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতাকে কারণ দেখিয়ে গত শুক্রবার থেকে সারা দেশে বন্ধ হওয়া বাস চলাচলও শুরু হয় সেদিন থেকেই। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন স্বস্তি আসে দেশে; তেমনি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে নানা জল্পনা-কল্পনারও অবসান হয়।

বিশেষ করে দেশজুড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দেশে এই প্রথম এমন আন্দোলন বেশ সফলভাবেই সামলাতে পেরে স্বস্তি ফিরে আসে সরকারেও। কোনো প্রকার সংঘর্ষ ও বলপ্রয়োগ ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরত পাঠাতে পেরে প্রশংসা পায় সরকারের সহনশীল রাজনীতিও। যদিও শেষদিকে আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষ ঢুকে যাওয়ায় এবং তাদের ফেরাতে পুলিশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে; কিন্তু সে আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের কোনো আগ্রহ না থাকায় সেই পরিস্থিতিও বেশ সফলভাবেই সামাল দিতে পেরেছে সরকার।

পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসায় উদ্বেগমুক্ত হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শুরুর দিকে আন্দোলনকে ঘিরে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে দল। আন্দোলনকে ঘিরে সুবিধাবাদী মহলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠায় ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার নানা ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হতে থাকলে উদ্বেগ পেয়ে বসে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রাজপথ থেকে বিতাড়নের প্রস্তাবও আসে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্ব ও কঠোর নির্দেশনায় শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই পরিস্থিতি সামলানো গেছে।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সরকারের উচ্চপদস্থ মহল ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব যে কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল, তা স্পষ্ট হয় গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রীদের উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে। বৈঠকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা আন্দোলন নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ জানালে এবং স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে দেশ স্থবির হয়ে গেছেÑ এমন বক্তব্য দিলে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এত দুর্বল নার্ভের লোক দিয়ে কি চলে? ছোটখাটো ঘটনার সময় নার্ভ শক্ত থাকতে হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে সরকার কোনো রকম বিব্রত নয়। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে সিরিয়াস কিছু দেখিনি। আন্দোলন বলতে যা বোঝায় তা তো ওরা করতেই পারেনি। আন্দোলন মানে রোদে পুড়বে, বৃষ্টিতে ভিজবে। এরপর ক্লান্ত হয়ে যাবে। তাহলেই তো আন্দোলন বলা যাবে। এমন তো কিছু ঘটেনি।’

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। তিনি গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং সংকট সমাধানে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তার স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাদের ক্লাসে ফেরত পাঠাতে হবে। এ জন্য তিনি দফায় দফায় সরকারের মন্ত্রী, দলের শীর্ষ নেতা ও পুলিশ প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। তারপরও যখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরছিলেন না, তখন তিনি গণভবনের এক অনুষ্ঠান থেকে নিজে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানান।

গত রোববার আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ ঘটায় কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার শঙ্কার কথা জানিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের রাস্তা থেকে নিয়ে স্কুলে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষ ঢুকে গেছে। এরা মানুষ না। এরা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। এমনকি শিক্ষার্থীদের সব দাবি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। পরদিন গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভায় বৈঠকে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইনের অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সরকারের প্রতি আশ্বাস ফেরে শিক্ষার্থীদের। তারা ক্লাসে ফিরে যান। শান্ত হয়ে আসে দেশ।

এ ব্যাপারে সেতুমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কালবিলম্ব না করে ক্যাম্পাসে ফিরে গেছে। পড়াশোনায় মনোনিবেশ করছে। কয়েক দিনের উত্তাল পরিস্থিতি কাটিয়ে এখন স্বস্তি ফিরে এসেছে। জাতি এখন স্বস্তি পাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যাপারে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সতর্ক ছিলেন। এ আন্দোলনকে ঘিরে সরকারবিরোধী নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হবে এমন আভাসও দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি সবাইকে সতর্ক থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকায় এবং কৌশলগত কারণে প্রধানমন্ত্রী চুপ থাকতে বলেছিলেন সবাইকে। তার কঠোর নিদের্শ ছিল, দল বা সরকারের কোনো ভুলে যেন আন্দোলন অন্যদিকে বাঁক না নেয়। বিশেষ করে বিএনপি যেন আন্দোলনকে রাজনৈতিক ইস্যু করতে না পারে। এ জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত না দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা তাদের সন্তান ও ছাত্রছাত্রীদের বুঝিয়ে ঘরে ফেরাক। শেষ পর্যন্ত তাই-ই হয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলো আরো জানায়, মাঝখানে একদিন অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার সারা দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেও আন্দোলন থামানো না গেলে সরকারের ভাবমূর্তি সংকটের কথা বলেন দলেন শীর্ষ নেতৃত্ব। এ সময় আন্দোলন থামাতে কঠোর হওয়ার পরামর্শও দেন তারা। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। সেখানে সবাই কঠোর অবস্থানে যাওয়ার বিষয়ে একমত হন। কিন্তু সে প্রস্তাব আমলে না নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগের মতোই শান্তিপূর্ণভাবে পরিস্থিতি সামালের নির্দেশ দেন। এ সময় তার নির্দেশ ছিল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচিতে বলপ্রয়োগ করতে গেলে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়লে এবং পরিবহন শ্রমিকরা ছাত্রদের মুখোমুখি হলে নৈরাজ্য বেড়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে গত রোববার গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি নির্দেশনামূলক বক্তব্য খুবই কাজে লেগেছে বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। দলের নেতারা বলেন, ওই বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়ার তথ্য জানিয়ে সবাইকে সতর্ক ও সাবধান করতে পেরেছেন। তিনি দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়ায় এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নিজের উপলব্ধি ও ভালোবাসা প্রকাশ পাওয়ায় আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরেছেন। ওই বক্তব্যে একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতেও কাজ হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সার্বিক পরিস্থিতি সফলভাবে সমাধান করতে পারার মধ্য দিয়ে সরকার ও দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। দলীয় সূত্রমতে, এই সফলতার মূলে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি দৃঢ় ছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যাপারে তাকে কখনো দুর্বল হতে দেখা যায়নি। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাস্তবমুখী নেতৃত্বের কারণেই দল ও সরকার ঐক্যবদ্ধভাবে সুশৃঙ্খল থেকে পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছে। বিশেষ করে বিএনপির নানামুখী ষড়যন্ত্র, এমনকি এর মধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে টেনে আনার ব্যাপারটিও বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছেন তিনি।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, সংকটের সময় যে দৃঢ় নেতৃত্ব দরকার, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তা আরেকবার দেখালেন। শুরু থেকেই তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে দৃঢ় ছিলেন। হয়েছেও তাই। আশা করছি তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে।

"