শীর্ষ জঙ্গি নেতা বোমারু মিজান ভারতে গ্রেফতার

লুকিয়ে ছিলেন কর্ণাটকে

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির শীর্ষ নেতা মিজান ওরফে জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে ভারতে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত সোমবার মিজানকে ভারতের বেঙ্গালুরু শহর থেকে গ্রেফতার করে দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। একই সময়ে ভারতের কেরালা থেকে আরো দুই জেএমবি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বোমারু মিজান ভারত ও বাংলাদেশে মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি। চার বছর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল জঙ্গিরা। এরপর থেকে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। তার গ্রেফতারের বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এনআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। মিজানকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ পুলিশ। এদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দুদিন আগে মালাপ্পুরাম জেলার কোতাক্কাল থেকে আবদুল করিম ও মুস্তাফিজুর রাহমান নামের দুজনকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার করে। তারা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম অঞ্চলের বাসিন্দা। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে বেঙ্গালুরু শহর থেকে বোমা মিজানকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কর্ণাটকের রামনগর জেলায় লুকিয়ে ছিলেন।

টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, বোমা মিজান বেশ কয়েকবার মালাপ্পুরাম সফর করেছে এবং অন্য অভিযুক্তদেরও থাকার ব্যবস্থা করেছে। সে বোমা তৈরির বিশেষজ্ঞ ছিল। বোমা মিজানের আস্তানায় তল্লাশি চালিয়ে কিছু ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য ও কিছু বোমা তৈরির উপকরণ উদ্ধার করেছে এনআইএ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিহারের বোধ গয়া এবং ২০১৪ সালে বুরদোয়ানের বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাছাড়া বোমা মিজান বাংলাদেশের বিভিন্ন মামলারও আসামি। এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি হিন্দুস্তান টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কাওসার ওরফে জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান এবং সালাউদ্দিন সালেহিন ভারতে জেএমবির নতুন শাখা চালু করেছে।

এনআইএ তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে একটি বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই বিস্ফোরণস্থলটি আসলে জামাতুল মুজাহিদিনের আস্তানা এবং বোমা ও অস্ত্র তৈরির কারখানা। প্রথম দিন থেকে জেএমবির যে ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, সে হলো কাওসার। বাংলাদেশে সে ‘বোমা মিজান’ নামেই পরিচিত। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির দুই নারী সদস্য ও আরেক ব্যক্তি জানায়, কাওসারই মোটরবাইকে এসে ওই আস্তানায় তৈরি করা বোমা নিয়ে যেতো। কী পরিমাণ দেশি গ্রেনেড বানাতে হবে, সেটাও আগেভাগে বলে দিত সে। এমনকি, জঙ্গি আশ্রয়স্থল হিসেবে খাগড়াগড়ের ওই বাড়িটি নির্বাচনেও কাওসারের ভূমিকা ছিল।

বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় পরবর্তী সময়ে এনআইএ জানতে পারে, ত্রিশালে পুলিশ ভ্যান থেকে ছিনতাই হওয়া জেএমবির জঙ্গি মিজান ওরফে জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানই হচ্ছে এই কাওসার। খাগড়াগড় হামলার আসামি হিসেবে তাকে ধরতে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ভারত সরকার।

কে এই বোমারু মিজান : ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবির জঙ্গিরা বোমা মিজানকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি ভারতে পালিয়ে ছিলেন। জেএমবির এই শীর্ষ নেতা মিজান বাংলাদেশে বহু নাশকতার হোতা। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ‘বোমারু মিজান’ নামে পরিচিত হলেও ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে তার নাম ‘কাওসার’। গত সোমবার ভারতের বেঙ্গালুরু শহরের এক গোপন আস্তানা থেকে গ্রেফতারের পর আবারও আলোচনায় এসেছে বোমা মিজান।

ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে বোমা মিজানের সঙ্গে ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গি হলেন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি ও রাকিব ও রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ। এর মধ্যে হাফেজ মাহমুদকে ওই দিন দুপুরেই টাঙ্গাইলে স্থানীয় জনতার সহায়তায় আটক করে পুলিশ। পরে গভীর রাতে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন তিনি। অন্যদিকে, বোমা মিজান ও সালেহীনের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বোমারু মিজান হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন ১৮ মামলার আসামি। সে তেজগাঁও পলিটেকনিকের ছাত্র এবং তার বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহে। চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে ২০০৫ সালে মিজানের তৈরি বোমা দিয়ে সারা দেশে হামলা চালানো হয়েছিল। চট্টগ্রামের হামলাগুলোতে নেতৃত্ব দেন মহম্মদ ও মিজান। এর মধ্যে মিজান জেএমবির বোমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পুলিশ তাদের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে। বোমা হামলার একাধিক মামলায় এদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। তবে মিজানকে কাশিমপুর কারাগার থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার সময় বোমা হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেয় জেএমবি সদস্যরা। সেই থেকে তিনি পলাতক।

এদিকে, ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) ২০১৬ সালে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, ভারতের বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত বোমারু মিজান কলকাতার আশপাশেই ঘাপটি মেরে আছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর একটি বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়। ওই বিস্ফোরণস্থলটি আসলে জামাতুল মুজাহিদিনের আস্তানা এবং বোমা ও অস্ত্র তৈরির কারখানা।

প্রথম দিন থেকে জেএমবির যে ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন কাওসার। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির দুই নারী সদস্য ও আরেক ব্যক্তি জানায়, কাওসারই মোটরবাইকে করে এসে ওই আস্তানায় তৈরি করা বোমা নিয়ে যেতেন। কী পরিমাণ দেশি গ্রেনেড বানাতে হবে, সেটাও আগেভাগে বলে দিতেন তিনি। এমনকি, জঙ্গি আশ্রয়স্থল হিসেবে খাগড়াগড়ের ওই বাড়িটি নির্বাচনেও কাওসারের ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় পরবর্তী সময়ে এনআইএ জানতে পেরেছে, জেএমবির জঙ্গি মিজানই হচ্ছে এই কাওসার।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরেই খাগড়াগড় মামলায় চার্জশিট দিয়েছে এনআইএ। তাই বিচার শুরু হওয়ার আগেই গোয়েন্দারা কাওসারকে ধরতে চান।

এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ মে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলায় বোমা মিজানকে ২০ বছর এবং তার স্ত্রী হালিমা বেগমকে ৫ বছরের কারাদন্ড দেয় ঢাকার একটি আদালত। এর আগে ২০১২ সালের ৩ ?জুন অপর এক অস্ত্র মামলায় ঢাকার অপর এক আদালত তাদের ৩৭ বছর কারাদন্ড দেন। তারও আগে পৃথক দুটি মামলায় তাদের ৩৬ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১৫ মে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর মিরপুরে বোমা মিজান ও তার স্ত্রী হালিমার একটি ভাড়াবাসা থেকে গ্রেনেড, অস্ত্র, গুলি ও বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করে র‌্যাবের একটি দল। ওই বছরেরই ১৫ জুন আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

 

"