ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা

শাহবাগ বাড্ডা বসুন্ধরায় পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্র্থীদের ঘরে ফেরার ঘোষণার মধ্যেই রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর শাহবাগ, বাড্ডা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

শাহবাগে অবস্থান করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। পরে উভয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর জলকামান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। বাড্ডার আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এ সময় ক্যাম্পাসে শত শত শিক্ষার্থী আটকে পড়ে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়। আর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।

দিনভর সংঘর্ষের পর গতকাল সন্ধ্যায় আফতাবনগর এলাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মাসফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মঙ্গলবার ও বুধবার (আজ ও আগামীকাল) বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি ৯ থেকে ১১ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামার সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যাবে।

বসুন্ধরা এলাকার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর প্রক্টর নাজমুল আহসান খান শিক্ষার্থীদের সামনে এনে ক্যাম্পাস বন্ধের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, এখানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, আমরা (শিক্ষকরা) অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি তোমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। আমাদের সঙ্গে পুলিশের সমঝোতা হয়েছে, তারা তোমাদের নিরাপদে ছেড়ে দেবে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, কবে খোলা হবে তা ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট এবং তোমাদের মেইলে জানিয়ে দেওয়া হবে।

মহাখালীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ফয়জুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দিনের ছুটি ঘোষণা করে সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। শিক্ষার্থীদের আসন্ন পরীক্ষায় বর্ধিত ছুটি হিসেবে এই ছুটি ঘোষণা করা হলো।

আগামীকাল বুধবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামার সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা জানিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্যই এ ছুটি দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শাহবাগে অবস্থান করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর জলকামান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ঘটনাস্থল থেকে হাসাইন ইশাদী মাহমুদ ও আশরাফুল হক ইশতিয়াক নামের দুজনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে আশরাফুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র বলে জানা গেছে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী জানিয়েছেন, সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের হাতে পুলিশের একজন কর্মী আহত হয়েছেন বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ঢাবির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, আমরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগে অবস্থান করতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে তাদের সঙ্গে বাক্বিত-া হয়। একপর্যায়ে পুলিশ জলকামান ছোড়ে। এর কিছুক্ষণ পর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

ডিএমপির রমনা জোনের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার জানান, শাহবাগ এলাকায় দুটি বড় বড় হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়, সে জন্য আমরা জলকামান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেই। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে।

বাড্ডার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সকাল ১০টার দিকে বাইরের কিছু ছেলে হঠাৎ ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে থেকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ধাওয়া করলে পালিয়ে যায়। এরপর ছাত্ররা বাইরে মিছিল করলে পুলিশ টিয়ারশেল ছোড়ে। পরে ছাত্ররা ভেতরে চলে আসে। প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রী আইনুন নাহার জ্যোতি বলেন, সকাল থেকে ক্যাম্পাস শান্ত ছিল। রুটিন অনুযায়ী সব বিভাগে ক্লাস হচ্ছিল। সোয়া ১০টার দিকে ক্যাম্পাসে হঠাৎ ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয় এবং লাঠি দিয়ে গেটে আঘাত করে হামলাকারীরা। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীরা গেট বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় কয়েকজন ছাত্র আহত হয়েছে। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত। কিন্ত হামলাকারীরা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, হামলাকারীরা স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মী। আবার কেউ কেউ বলছেন, হামলাকারীদের বেশভূষা দেখে মনে হয়েছে, তারা বস্তির লোক। অনেকের গায়ে কাপড় ছিল না। নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন কাপড় পরা ছিল।

বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার আশরাফুল কবির বলেন, আফতাবনগরে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলশান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শাহানুল, ভাটারা থানার ওসি কামরুজ্জামান ও কনস্টেবল আবদুর রউফ আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তবে ঠিক কয়জনকে আটক করা হয়েছে সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ সদস্যরা মাইকে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তারা পুলিশ সদস্যদের ওপর তেড়ে আসতে থাকে। পরে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে তিন ছাত্রকে আটক করে পুলিশ।

এদিকে তেজগাঁওয়ে আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররাও ক্যাম্পাসের ভেতরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করে। ক্যাম্পাসের বাইরে পুলিশ অবস্থান করায় কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এরপর থেকে বসুন্ধরা এলাকার ভেতরে যান চলাচল বন্ধ থাকে। পুলিশ জানিয়েছে, সকাল থেকেই বসুন্ধরা গেটের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় তারা অবস্থান নিয়েছিল যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়। পরে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা হয়। হামলাকারীরা বসুন্ধরার গেটের ভেতরে ঢুকে গেলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। তবে কারা হামলা করেছে তা জানাতে পারেনি পুলিশ। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে প্রথমে একত্রিত হয়। পরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গ্রামীণফোন অফিসের সামনে থেকে তারা পুলিশের ওপর প্রথমে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

"