কাল যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী : নতুন সাজে রূপপুর

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

পাবনা প্রতিনিধি

বিশ্বের পরমাণু ক্লাবে স্থান করে নেওয়ার অগ্রযাত্রায় আরেক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী কাল শনিবার শুরু হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দ্বিতীয় ইউনিটের চুল্লি (রি-অ্যাক্টর) বসানোর কাজ। এদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরসহ গোটা অঞ্চলে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। রূপপুর সেজেছে নতুন সাজে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, ইউনিট-১ এর নির্মাণ সুচারুরূপে শুরু করার আট মাসের মধ্যে দ্বিতীয় রি-অ্যাক্টর ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে। এটা একটি মাইলফলক। গত নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনিট-১ এর কংক্রিট ঢালাই উদ্বোধন করেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করে। এরপর থেকেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। এ কেন্দ্র নির্মাণকে ঘিরে পাবনা জেলার রূপপুরে পদ্মার পাড়ে চলছে মহাকর্মযজ্ঞ। সরকারের ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সার্বিক কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি তদারকি করছেন।

প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী ইউরিক লিমারেনকো বলেন, আট মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় স্থাপনার কাজ শুরু হচ্ছে, এটাই বড় কথা। মূল স্থাপনার কাজ শুরু হলে তার পরের ৬৮ মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তিনি আরো জানান, প্রতিদিন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশি কর্মী মিলে এক হাজারের বেশি লোক এখানে কাজ করছেন। এ প্রকল্পে থ্রি প্লাস রি-অ্যাক্টর বসবে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি যা শুধু রাশিয়ার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে রয়েছে। আর বাংলাদেশের রূপপুরেই হবে এর দ্বিতীয় ব্যবহার।

কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানান, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। প্রকৌশল চুক্তি ও নির্মাণ শিডিউল অনুযায়ীই পরিকল্পিতভাবে কাজ এগিয়ে চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাঁচ স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকায় এই প্রকল্পে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা নেই। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি মোকাবিলায় এই রি-অ্যাক্টর সক্ষম। জাপানের ফুকুসিমা দুর্ঘটনার কথা মাথায় রেখে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যে, প্লান্টটি বিদ্যুৎ সরবরাহবিহীন নিরাপদে থাকবে। পৃথিবীর ৩২ দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লির মধ্যে এটি হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এবং ফোর-জি ক্ষমতাসম্পন্ন।

শৌকত আকবর জানান, এ প্রকল্প থেকে ২০২২ সালে প্রথমে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং তার পরের বছর ২০২৩ সালে আরো এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্পের ‘লাইফ’ বা আয়ুষ্কাল হবে ৫০ বছর। আর তা সংস্কার করে দাঁড়াবে ৮০ বছরে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, এই কেন্দ্র থেকে ধোঁয়া নির্গত হবে না, শব্দও থাকবে না। চওড়া দেয়ালের মধ্যে ৮০ টনের রি-অ্যাক্টর বসবে। একবার রি-অ্যাক্টরে জ্বালানি ভরলে চলবে অনেক বছর। ফলে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

সূত্র জানায়, পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে গেলেও আণবিক চুল্লি পরিচালনায় পানির কোনো সমস্যা হবে না। এখানে দৈনিক মাত্র ১৭৫০ ঘনমিটার পানির প্রয়োজন হবে। রি-সাইক্লিং করে এর অর্ধেক পানি ব্যবহার করা যাবে। এ ছাড়া পদ্মা নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা ফিরিয়ে জাহাজ এবং কার্গো চলাচলের উপযোগী করা হবে। মূলত নৌপথেই বেশির ভাগ কাজ সম্পন্ন হবে। ২০২০ সালের মধ্যেই রি-অ্যাক্টর ভেসেলসহ সব যন্ত্রপাতি রাশিয়া থেকে চলে আসবে। এরপর এখানে অ্যাসেম্বলিং করা হবে। প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামো, সাইট ডেভেলপমেন্ট, মাটি পরীক্ষা, কনস্ট্রাকশন ল্যাবরেটরিসহ প্রথম পর্যায়ের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুই পর্যায় মিলে প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে এক লাখ ১৮ হাজার ১৮০ কোটি ৮১ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে রাশিয়া দিচ্ছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রথম পর্যায়ে ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি পর্যাপ্ত না হওয়ায় ইতোমধ্যে ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো ২১৯ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। নতুনভাবে অধিগ্রহণ করা পদ্মার বিশাল চরে চলছে মাটি ভরাটের কাজ। যতদূর চোখ যায় শুধু রোলার, এস্কেভেটর, পে-লোডার মেশিন ও ড্রাম ট্রাক চলাচলের দৃশ্য।

মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে তৈরি হচ্ছে গ্রিন সিটি আবাসন পল্লী। পাবনা গণপূর্ত অধিদফতর এগুলো বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যেই তিনটি ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। এই এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ তলা ১১টি এবং ১৬ তলা আটটি ভবন তৈরির কাজ শেষের পথে। ২২টি সুউচ্চ ভবন তৈরি হবে এ চত্বরে। এ ছাড়া থাকবে মাল্টিপারপাস হল, মসজিদ ও স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থাপনা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের দ্বিতীয় কংক্রিট ঢালাই কাজের উদ্বোধন উপলক্ষে রূপপুরে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

রূপপুর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন কেন্দ্র করে ঈশ্বরদী-পাকশীর রূপপুর এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাণ লাইসেন্স প্রদান : পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের নকশা ও নির্মাণ লাইসেন্স বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে (বিএইসি) দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। গত রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে এ লাইসেন্স হস্তান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ)গাইডলাইন অনুসারে মূল নির্মাণকাজ শুরুর আগে এ লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

শনিবার দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ কাজের (ফার্স্ট কংক্রিট পোরিং-এফসিপি) উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকবেন রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী (শিল্প ও জ্বালানি) দিমিত্রি কোজাক। এ ছাড়া রাশিয়ার পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।

"