স্বপ্নের পদ্মা সেতু দক্ষিণে অর্থনৈতিক অঞ্চলের হাতছানি

চলছে নতুন রেললাইনের কাজ

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রমের পর বহুল আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। ঢাকা থেকে মাওয়া ফেরিঘাট পার হলেই দেখা যায় উন্নয়নের মহাযজ্ঞ। চার লেন সড়ক হচ্ছে। নতুন রেললাইনের কাজ চলছে। ঢাকা থেকে বরিশালের দূরত্ব ২৪৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু হলে সাড়ে চার ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে। এখন লাগে আট থেকে ১০ ঘণ্টা। তবে পদ্মা সেতু শুধু ঢাকার সঙ্গেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করবে না; বরং এটি দেশের অর্থনীতির চিত্রই বদলে দেবে। দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়ে উঠবে দক্ষিণাঞ্চ। পাঁচটি স্প্যান স্থাপনের পর ৭৫০ মিটার সেতু দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া সেতুর উভয় পাশে সড়কপথ নির্মাণের কাজও শেষ। অন্য কাজগুলোও দ্রুত এগোচ্ছে। সরকার আশাবাদী, এই বৃহৎ অবকাঠামো দেশের জিডিপিতে অন্তত ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। এদিকে, পদ্মা সেতু এলাকায় ব্যাপক সবুজায়নের কাজও এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে ছায়াঘেরা পরিবেশ। এপ্রোচ সড়কসহ যেসব এলাকায় এখন গাছ লাগানো হচ্ছে দুই বছরের মধ্যে তাও সবুজবেষ্টিত হয়ে যাবে। পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে এলাকাটি।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য জাজিরা প্রান্তের নাওডোবায় বাড়ি-ঘরের সঙ্গে অনেক গাছপালা অপসারণ করতে হয়। পরিবেশের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সেতু কর্তৃপক্ষ ব্যাপক বনায়নের উদ্যোগ নেয়। সার্ভিস এরিয়া ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর মোট ১২৩ একর জায়গায় প্রায় ৩০ হাজার গাছের চারা লাগানো হয়। অ্যাপ্রোচ সড়কের দুই পাশেও লাগানো হয়েছে ৭৩ হাজার ফলদ ও ঔষধি গাছ। এই আয়োজন এলাকাটি সবুজ বেষ্টনীতে রূপ নেবে, পাশাপাশি সম্ভাবনা জাগাবে পর্যটন শিল্পের। সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এই সবুজ বেষ্টনী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখতে পারবে।

বৃহত্তর বরিশাল মানে দক্ষিণাঞ্চলের এখনকার ছয়টি জেলাÑ বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও ভোলা। আশার কথা, সেই বরিশালে রেললাইন স্থাপনের তোড়জোড় চলছে। পদ্মা সেতু চালু হলে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত যে রেললাইন আছে, সেটি প্রথমে যাবে বরিশাল পর্যন্ত। এরপর বরিশাল থেকে পায়রা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত সেটি সম্প্রসারিত হবে। খুলনা থেকে মোংলা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত আরেকটি রেললাইন চালুরও পরিকল্পনা আছে সরকারের। সে ক্ষেত্রে দুটি সমুদ্রবন্দরই রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। আর এর থেকে বরিশালের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারেরও কম। এসবই হবে পদ্মা সেতুর বদৌলতে।

পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ‘২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত পদ্মা সেতুর কাজের সামগ্রিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৬ শতাংশ। গুণগত মান নিশ্চিত করে অল্প সময়ের মধ্যে আমরা যাত্রীদের জন্য সেতুটি উন্মুক্ত করে দিতে কঠোর পরিশ্রম করছি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অঙ্গীকার পূরণ হচ্ছে।

২০১৭ সালের ৭ অক্টোবর শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান স্থাপন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ জানুয়ারি দ্বিতীয় স্প্যান স্থাপন করা হয়। তৃতীয় স্প্যানটি স্থাপন করা হয় ১১ মার্চ। চতুর্থ ও পঞ্চম স্প্যান স্থাপন করা হয় যথাক্রমে ১৩ মে ও ২৯ জুন।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতুটিতে মোট ৪১টি স্প্যান থাকবে, এর প্রতিটির দৈর্ঘ্য হবে ১৫০ মিটার। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, ৪২টি পিলারে মোট ৪১টি স্প্যান স্থাপন করা হবে। দেশের বৃহত্তম এ সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এর কাজ সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি এই প্রকল্পে কাজ করছেন চীনা, আমেরিকান, ব্রিটিশ, ভারতীয় ও জাপানি নাগরিকরা।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ২৯ জুন ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে পরিদর্শনকালে বলেন, ‘যাত্রীদের জন্য সেতুটি খুলে দিতে একের পর এক স্প্যান বসানো হচ্ছে। প্রথমবারের মতো সরকার পদ্মা সেতুর মতো একটি বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যয়ী নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘আমাদের নিজস্ব তহবিলে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের মতো একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন স্পষ্টতই বিশ্বব্যাপী আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।’

"