এবারও প্রভাবশালীদের দখলে রাজধানীর পশুর হাট

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

হাসান ইমন

এবারও রাজধানীর ২০টি অস্থায়ী পশুর হাটের মধ্যে ১২টি দখলে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। সাধারণ ব্যবসায়ীরা ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারেননি। সিন্ডিকেটের কব্জায় পড়ে বাকি আটটি হাটের জন্য কোনো টেন্ডারই পড়েনি। অভিযোগ রয়েছে, আর এই কাজে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছে সিটি করপোরেশনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এতে মোটা অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বঞ্চিত হবে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০টি কোরবানির অস্থায়ী পশুর হাট বসার সিদ্ধান্ত ছিল। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ছিল ১৩টি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় সাতটি। হাটের ইজারা নিতে প্রথম থেকেই স্থানীয় কয়েকটি সিন্ডিকেট কম দামে হাট নিতে নানা কৌশল নেয়। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগ দেয় সিটি করপোরেশনের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও। সিন্ডিকেট করে এ ১২টি হাটের সবকটিই পেয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মানুযায়ী ঈদের তিন দিন আগে বসবে এসব হাট। চলবে ঈদের দিন পর্যন্ত। এই মুহূর্তে হাটগুলো বসাতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাটটিও কোরবানির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার রাজধানীর ২০টি স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি। এখন পর্যন্ত ঢাকা উত্তরে ছয়টি হাট ৯ কোটি ৫৩ লাখ ৯২ হাজার ৫৬২ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি একটিতে কোনো টেন্ডারই পড়েনি। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন এলাকায় ১৩টি পশুর হাটের মধ্যে ছয়টি হাটের ইজারা সম্পূর্ণ হয়েছে। এই ছয়টি হাট ২ কোটি ৭০ লাখ ৯৭ হাজার ১৫০ টাকায় ইজারা দিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া বাকি সাতটিতে কোনো টেন্ডারই পড়েনি।

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীতে বসতে যাওয়া ২০টি পশুর হাটের মধ্যে ১২টি দখলে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। একাধিক ইজারাদার বলেন, হাট ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম তিনটি দরপত্র জমা পড়তে হয়। সাধারণ ইজরাদাররা দরপত্রই কিনতে পারেননি। দু-একজন কিনলেও ভয়ে জমা দেননি বা দিতে পারেননি। ফলে প্রভাবশালী চক্র পছন্দমতো দর দিয়ে হাটগুলো ইজারা নিয়েছে। আবার কয়েকটি হাটের ক্ষেত্রে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। সেগুলো অতীতের মতো ঈদের আগমুহূর্তে দলীয় লোকদের দিয়ে পরিচালনা করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আফতাবনগর পশুর হাটটি বসানোর পরিকল্পনাই বাদ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে নতুন করে খিলক্ষেত ৩০০ ফুট সড়ক ও দক্ষিণ পার্শ্বের বসুন্ধরার প্রাচীরের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা, তেজগাঁও পলিটেকনিক কলেজ মাঠ ও উত্তরখান ময়নারটাক এলাকায় মোট তিনটি হাট বসবে। সাধারণ ইজারাদাররা মনে করেন, হাটগুলো কেবল দলীয় নেতা-কর্মীরাই কীভাবে পেল?

এ প্রসঙ্গে ইজারার সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। জমা পড়া দরপত্রের কাগজপত্র ঠিক থাকলে শীর্ষ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কে, কোনো দল করে, তা বিবেচ্য বিষয় না। অবশ্য বিগত বছরের চেয়ে কম দর হলে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হবে। এবার সাতটি হাটের মধ্যে একটিতে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি বলেও জানান তিনি। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, নতুন করে আরো তিনটি হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই হাটগুলোর জন্য শিডিউল ও দরপত্র বিক্রির জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিএনসিসির ইজারা দেওয়া ছয়টি হাটের ইজারাদারদের অধিকাংশই স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর গোলচত্বর সংলগ্ন খালি জায়গার হাটটি ইজারা পেয়েছেন শফিকুল ইসলাম, ভাটারার হাট ইজারা পেয়েছেন মারফত আলী, মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী সড়ক সংলগ্ন (বছিলা) পুলিশ লাইনসের জায়গার হাট পেয়েছেন মো. শাহ আলম, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গার হাট পেয়েছেন আশরাফ উদ্দিন ও মিরপুরের ডিওএইচএস সংলগ্ন উত্তর পাশের খালি জায়গা পেয়েছেন জাহাঙ্গীর হোসেন।

একই অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীন হাটগুলোরও। উত্তর শাজাহানপুরের খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন মৈত্রীসংঘের মাঠ পেয়েছেন আবদুল লতিফ, হাজারীবাগ হাটের ইজারা পেয়েছেন জাহিদুল কবির, রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ পেয়েছেন রহমতগঞ্জ মুসলিম সোসাইটির পক্ষে হাজি শফি মাহমুদ, কামরাঙ্গীরচর চেয়ারম্যান বাড়ির হাটিটি পেয়েছেন আবুল হোসেন সরকার, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পাশের হাটের ইজারা পেয়েছেন আসাদুজ্জামান ও শ্যামপুর বালুর মাঠ পেয়েছেন শেখ মাসুক রহমান। এসব হাটের ইজারাদাররা প্রত্যেককেই স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী।

এই বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে যদি সব হাট স্থানীয় প্রভাবশালীরা লোক পেয়ে যায়, তাহলেও কিছু করার নেই।

"