ডিএমপির ৫০তম হাতিরঝিল থানা

প্রথম মামলা মাদকের, জিডি ২৪

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০তম থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে ‘হাতিরঝিল থানা’। গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই থানা উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জামান খান কামাল। সে হিসাবে গত রোববার ছিল থানাটির প্রথম কার্যদিবস। আর গতকাল সোমবার দ্বিতীয় দিন। প্রথমদিনে কোনো মামলা রুজু হয়নি। তবে এ দিন রাত ১২টার কিছু পর অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনে গিয়ে একটি মাদক মামলা হয়। রুমি আক্তার ও শামসুল ইসলাম নামে দুইজনের বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলা করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবদুর রশিদ। এটিই এই নতুন থানার প্রথম মামলা। আর গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত দেড় দিনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে ২৪টি। বেশিরভাগ জিডি কোনো কিছু হারানো সংক্রান্ত। তবে একটি জিডি হয়েছে নারী নির্যাতনের।

হাতিরঝিলের মধুবাগ অংশে নির্মিত সেতুটি অতিক্রম করে ডানদিকের গলি দিয়ে একটু সামনে মিনিট তিনেকের পথ হাটলেই বামপাশে চোখে পড়বে সুন্দর একটি ছয়তলা ভবন। পুরো ভবনটি ভাড়া নিয়ে থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভেতরে প্রবেশ পথেই একটি অস্থায়ী সাজানো সুন্দর গেট। উদ্বোধনের জন্য গেটটি করা হয়েছিল। প্রবেশ পথের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো ফুলদানিতে রয়েছে জীবন্ত ফুলের চারা। থানার ভেতরে ডিউটি অফিসারের কক্ষের ঠিক সামনেই পৎ পৎ করে উড়ছে জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ পুলিশ ও ডিএমপি পুলিশের নিজস্ব পতাকা। মূল ভবনে ঢোকার আগে ডানদিকে ডিউটি অফিসারের কক্ষ।

ডিউটি অফিসারের কক্ষে তিনটি টেবিল। একটিতে ডিউটি অফিসার বসেন। অন্য দুইটিতে ওয়্যারলেস নিয়ন্ত্রণ ও সার্ভিস ডেলিভারি শাখার কর্মকর্তারা বসেন। এই কক্ষটি অতিক্রম করে একটু ভেতরে রয়েছে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক হাজতখানা। সুন্দর কালো টাইলসে সাজানো হাজতখানা দুইটির ভেতরে রয়েছে পরিচ্ছন্ন টয়লেট। হাজতখানা দুইটি সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মূল ভবনে ঢোকার আগে বামপাশে নারীদের সহায়তার জন্য ‘নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র’। আর ভবনে ঢুকেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পরিদর্শক (তদন্ত) ও পরিদর্শকের (অপারেশন) জন্য সুসজ্জিত তিনটি পৃথক কক্ষ।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ডিউটি অফিসার এসআই তাহমিনা আক্তার জানান, দ্বিতীয় দিনের মতো কার্যক্রম চলছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত (সাধারণ ডায়েরি) জিডি দায়ের হয়েছে ২৪টি। একজন নারী ছাড়া পুরুষ জিডিকারীর সংখ্যাই বেশি। সব জিডিই হারানো সংক্রান্ত। প্রথমদিন রাতে এক নারী তার স্বামীর বিরুদ্ধে জিডি করেছেন। তবে দ্বিতীয় দিনের প্রথম দিকে অর্থাৎ রাত ১২টার পর মাদক সংক্রান্ত একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী গোয়েন্দা পুলিশের একজন পরিদর্শক।

গতকাল জিডি করতে আসতে শিক্ষার্থী মনির হোসেন জানান, মোটরসাইকেলের লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়ার কারণে জিডি করেছেন। তিনি বলেন, এত দিন পুলিশি সহায়তার জন্য রমনা থানায় যেতে হতো। এখন খুব দ্রুতই জিডিসহ সব কাজ করা যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা সুমন জানান, হাতিরঝিল আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। এখানে একটি থানা খুবই দরকার ছিল। এখন চোর-ডাকাতরা হানা দিলে খুব সহজে পুলিশকে জানানো যাবে। গৃহবধূ রাজিফা রোশনি জানান, থানাটি কাছাকাছি হওয়ায় অনেক নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এতে ইভটিজিংসহ অন্যান্য অপরাধ কমে আসবে। এছাড়া স্থানীয় বখাটেরাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

নতুন থানাটির সার্বিক কার্যক্রমের বিষয়ে ওসি আবু মো. ফজলুল করিম জানান, পুলিশের প্রথম কাজ হলো নাগরিকদের আইনি সহায়তা দেওয়া। মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে থানায় অভিযোগ করতে পারবে। আমরা সর্বোচ্চ দ্রুততর সময়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করব। অপরদিকে হাতিরঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইকবাল হোসেন জানান, নতুন থানা সম্পর্কে আগে এলাকাবাসীকে জানাতে হবে। বেশি বেশি প্রচারণা চালাতে হবে। এজন্য মাইকিং বা পোস্টারিং করার ভাবনা আছে। তিনি আরো বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের আইনের আওতায় আনার মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাবে।

ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীর তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, রমনা, রামপুরা, গুলশান এবং বাড্ডা এই ৭ থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল হাতিরঝিলের প্রায় ১৬ কিলোমিটার সড়কটি। সড়কে কোনো দুর্ঘটনা হলেই পরিমাপের ফিতা নিয়ে হাজির হতেন পুলিশ কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময় লাগত থানার সীমানা শনাক্ত করতে। এসব সমস্যার সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে হাতিরঝিলকে আলাদা থানায় আওতাভুক্তির প্রস্তাব দেন অনেকে। অবশেষে গতকাল ডিএমপির ৫০তম থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করল ‘হাতিরঝিল থানা’।

হাতিরঝিল থানার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বাংলামোটরের একাংশ, ইস্কাটনের একাংশ, মগবাজার, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার একাংশ, পশ্চিম রামপুরা, উলন, নয়াটোলা, মধুবাগ, মীরবাগ, মহানগর আবাসিক এলাকা, হাতিরঝিল-বাড্ডা লিংক রোড, আবুল হোসেন রোড, ওয়াপদা রোড, ওয়্যারলেস মোড়ের একাংশ, পেয়ারাবাগ, দিলু রোড, মালিবাগ রেলক্রসিং, হাজীপাড়া, হোটেল সোনারগাঁও, হাতিরঝিল প্রজেক্ট, পুলিশ প্লাজা এলাকার একাংশ।

নতুন এ থানাটি পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের আওতাভুক্ত। এই বিভাগের উপকমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন বিপ্লব কুমার সরকার। তিনি জানান, নতুন থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আবু মো. ফজলুল করিম, পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন ও পরিদর্শক (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এস কে খোদা নেওয়াজ। ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর হাতিরঝিলে নতুন থানা স্থাপনের অনুমোদন দেয় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)।

"