বিশ্বকাপ ২০১৮

স্বপ্নের মঞ্চে ওঠার লড়াই

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

আমির হোসেন

তিন সপ্তাহ আগেও কি কেউ কল্পনা করেছিল বিশ্বকাপের এবারের আসরটি এমন হবে? যেখানে থাকবে না ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনার মতো সফল দলগুলো। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিদায় নিল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। আর্জেন্টিনা পেরুতে পারল না শেষ ষোলোর বৈতরণী। আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি তো গ্রুপ পর্বের গ-িই পেরুতে পারেনি!

প্রত্যেক পরতে পরতে নাটকীয়তার জন্ম দিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপ উপনীত হয়েছে সেমিফাইনালে। আজ থেকে শুরু হবে ফাইনালে ওঠার লড়াই। যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়ার মতো দল। এই চারটি দলের মধ্যে কেবল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের শিরোপা জয়ের ইতিহাস আছে। বাকি দুইটির সেরা সাফল্য সেমিফাইনাল। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম। আর ইংল্যান্ডের ক্রোয়েশিয়া। প্রথম সেমিফাইনালে বেলজিয়াম ফরাসিদের হারিয়ে দিলে এবং ক্রোয়েশিয়া ইংলিশদের পেছনে ফেলে উঠে আসতে পারলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ দেখতে নতুন দুই ফাইনালিস্টকে।

বেলজিয়াম

বেলজিয়ামের বিশ্বকাপের ইতিহাস খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। বিশ্বকাপে তাদের সেরা সাফল্য সেমিফাইনাল। তাও ৩২ বছর আগে। এবার আবার তারা সেমিফাইনালে এসেছে। এবারই প্রথম তারা গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে এসেছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে তারা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। শেষ আটে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছিল। সেমিফাইনালে তারা মুখোমুখি হয়েছিল সেই সময়ের সেরা তারকা দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার। অবশ্য আর্জেন্টিনার সঙ্গে আর পেরে ওঠেনি রেড ডেভিলসরা। ২-০ গোলে হেরে সেমিফাইনালেই থমকে দাঁড়ায় তাদের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তারা ফ্রান্সের কাছে ৪-২ গোলে হার মেনে চতুর্থ হয়ে বিদায় নেয়। এবার সেমিফাইনালে সেই ফ্রান্সকে পেয়েছে বেলজিয়াম।

সময়ের পরিক্রমায় বেলজিয়াম এখন দাপুটে দল। দ্রিস মার্টেন্স, ইডেন হ্যাজার্ড, ভিনসেন্ট কোম্পানি, রোমেলু লুকাকু, কেভিন ডি ব্রুইনি, থমাস ভারমালেন ও ফেলিয়ানিদের সমন্বয়ে সোনালি প্রজন্মে পরিণত হয়েছে তারা। তাদের ঘিরে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বেলজিয়ামের মানুষ। হ্যাজার্ড-লুকাকুরা পারবে কি ১১.৩৫ মিলিয়ন বেলজিয়ামবাসীর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে? এবারই তাদের সামনে সেরা সুযোগ।

ক্রোয়েশিয়া

ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস সেমিফাইনালে আসা দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক। এই দেশটি ১৯৯৪ সালের আগে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি। অবশ্য এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে তারা সেমিফাইনাল খেলেছিল। সেবার গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড ও জাপানকে পেয়েছিল। গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে শেষ ষোলোতে উঠেছিল। এবারও তারা গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড ও নাইজেরিয়াকে পেয়েছিল। এবার অবশ্য গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে এসেছে। ১৯৯৮ সালে শেষ ষোলোতে রোমানিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। তারপর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সেমিফাইনালে তারা পেয়েছিল ফ্রান্সকে। তাদের কাছে হেরে ফাইনালে যাওয়া হয়নি তাদের। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেশে ফিরেছিল। বিশ্বকাপে সেটাই তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য। তারপর গেল ২০ বছরেও ক্রোয়েশিয়া গ্রুপ পর্ব গ-ি পেরুতে পারেনি। এমনকি ২০১০ সালে তারা বাছাই পর্বই পেরুতে পারেনি।

এবার তাদের সামনে বিশ্বকাপের সেরা সাফল্য অর্জন করার সুযোগ। লুকা মদ্রিচ, মারিও মানজুকিচ, রাকেটিচরা কি পারবেন ক্রোয়েশিয়াকে তাদের সেরা সাফল্য অর্জন করতে?

ইংল্যান্ড

বিশ্বকাপ জয়ী আট দলের মধ্যে একটি ইংল্যান্ড। এবার তাদের সামনে দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। ফুটবলের জনক বলে দাবি করা ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালের পর আর শিরোপার দেখা পায়নি। ১৯৯০ সালে তারা অবশ্য সেমিফাইনালে উঠেছিল। টাইব্রেকারে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল। এরপর থেকে তারা বিশ্বকাপে একের পর এক হতাশার নজির স্থাপন করে বিদায় নিয়েছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তো তারা খেলারই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ২০০৬ সালের আগে একবারও কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারেনি। তবে গ্যারেথ সাউথ গেটের তত্ত্বাবধানে তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে ভর করে এবার উড়ছে ইংল্যান্ড। ১৯৯০ সালের পর আবার তারা সেমিফাইনালে এসেছে। স্বপ্ন দেখছে ৫২ বছর পর শিরোপা জয়ের। হ্যারি কেন, স্টার্লিং, ডেলে আলি, পিকফোর্ডরা পারবেন কি অর্ধশত বছর পর ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের শিরোপা উপহার দিতে?

ফ্রান্স

ইংল্যান্ডের মতো ফ্রান্সেরও একবার শিরোপা জয়ের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৮ সালে তারা বহুল প্রার্থিত শিরোপার স্বাদ পেয়েছিল। অবশ্য বেশ কয়েকবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও তারা খালি হাতে ফেরত এসেছে। ২০০৬ সালে ফাইনালে উঠেও জিনেদিন জিদানের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের ঢুস কা-ে খালি হাতেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে সেবার চতুর্থ শিরোপা জয়ের উল্লাসে মেতেছিল ইতালি। তার আগে ১৯৫৮ সালে তারা ব্রাজিলের কাছে ৫-২ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করেছিল। ১৯৮২ সালে সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছিল। ১৯৮৬ সালেও তারা সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল সেই জার্মানির কাছে হেরে।

১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের কাছে হেরেছিল। ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে পশ্চিম জার্মানির কাছে। আর ২০০৬ সালে ইতালির কাছে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিল ফ্রান্স। এবার অবশ্য তাদের সামনে ব্রাজিল, জার্মানি ও ইতালির কেউ নেই। এবার কি তাহলে দ্বিতীয় শিরোপার স্বাদ পাবে ফরাসিরা? অ্যান্তনিও গ্রিজমান, অভিলার জিরোড, কালিয়ান এমবাপ্পে, রাফায়েল ভারানেরা কি পারবেন ফ্রান্সের শিরোপার খরা ঘোচাতে?

"