দুঃস্বপ্নের গুহা থেকে মুক্তি

থাইল্যান্ড : উদ্ধার ৬, মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিল খুদে ফুটবলাররা

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

থাইল্যান্ডের দীর্ঘতম গুহা থাম লুয়াং ন্যাং। গুহাটি সাপের মতো প্যাঁচানো। ভেতরে কোথাও ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু, কোথাওবা অত্যন্ত সরু আবার কোথাও পানিতে পূর্ণ। ফাটলগুলোও যেকোনো সময় ডেকে আনতে পারে ঘোর বিপদ। এই অবস্থায় গুহাটির ভেতরে উদ্ধার অভিযান যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন উদ্ধারকারী ডুবুরির মৃত্যুর ঘটনায়। কিন্তু কথায় আছে, ‘সব ভালো তার শেষ ভালো যার।’ তাই বলা যায়, এই যাত্রায় সেটাই ঘটল। অবশেষে দুঃস্বপ্নের গুহা থেকে মুক্তি মিলল। মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিল থাই খুদে ফুটবলারদের ছয়জন। থাইল্যান্ডের জলমগ্ন গুহা থাম লুয়াংয়ের চার কিলোমিটার ভেতরে দুই সপ্তাহ আটকে থাকার পর গতকাল রোববার এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে সন্ধ্যানাগাদ প্রথমে দুই কিশোরকে বাইরে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ছয়জনকে উদ্ধারের কথা নিশ্চিত করে থাই রয়্যাল নেভি। এরপর রাতের জন্য স্থগিত করা হয় উদ্ধার অভিযান। আজ আবার শুরু হওয়ার কথা।

১২ ফুটবলার ও তাদের কোচকে উদ্ধারে ঝুঁকি নিয়েই সকাল ১০টায় চূড়ান্ত অভিযান শুরু করে কর্তৃপক্ষ। দক্ষ দেশি-বিদেশি ১৩ ডুবুরিসহ ১৮ জন ঢোকেন গুহার ভেতরে। গুহার বাইরে অপেক্ষায় থাকেন স্বজনরা। প্রস্তুত রাখা হয় ট্রলি, অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। অভিযান চলাকালে মানবিক কারণেই উৎকণ্ঠায় সময় কাটছে থাইল্যান্ডবাসীর। আর এ উদ্ধার অভিযানের দিকে তাকিয়ে থাকা সারা বিশ্বও হাফ ছাড়ল। এর আগে সকালে আলো-বাতাসহীন অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করে দেশি-বিদেশি ডুবুরি ও নৌবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে চৌকস উদ্ধারকারী দল। শুরু হয় তাদের বিশেষ অভিযান ‘ডি-ডে’। বৃষ্টিবিঘিœত এই উদ্ধার অভিযানটিও ছিল রোমাঞ্চকর, শঙ্কারও। বিপজ্জনক এ অভিযানে দুজন ডুবুরি একজন করে ফুটবলারকে বের করে আনেন। দুজন ডুবুরি একজন কিশোর ফুটবলারকে বের করে আনার কাজে নিয়োজিত। সামনে একজন ডুবুরি, পেছনে আরেকজন। সামনের ডুবুরি কিশোর ফুটবলারের অক্সিজেন বোতল বহন করে উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেন, পেছনের ডুবুরি সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেন। এভাবেই ধাপে ধাপে সাফল্য আসতে শুরু করে। বের করে আনা হয় আটকে পড়াদের। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে দুই থেকে তিনদিন লেগে যাবে বলে কর্তৃপক্ষ জানায়।

অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন স্থানীয় মেয়র নারোংসাক ওসোটানাকোর্ন। অভিযান শুরুর সময় তিনি জানান, এখনই সময় আটকে পড়াদের বের করে আনার। ফুটবলারদের পরিবারও অভিযান শুরু করার অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া ফুটবলাররাও মানসিক ও শারীরিকভাবে দৃঢ় আছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করছি। স্বল্প সময়ের মধ্যেই একে একে প্রত্যেককে বের করে আনা হবে।’

উদ্ধারকারী দলের প্রধান নারংসাক ওজতনাকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের দিনটি ডি-ডে। কিশোরেরা যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। অন্য এমন কোনো দিন আসবে না, যেদিন আমরা আজকের চেয়ে বেশি প্রস্তুত থাকব। আজ (গতকাল রোববার) না হলে হয়তো আমরা সব সুযোগই হারাব।’

উদ্ধারকাজে দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া সবাইকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আজ সোমবার ওই এলাকা পরিদর্শনে যাবেন।

গত ২৩ জুন বেড়াতে গিয়ে বন্যার কারণে সৃষ্ট প্লাবনে আটকে পড়ে ফুটবল দলটি। এর ৯ দিন পর ২ জুলাই তাদের জীবিত থাকার খবর দেয় উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। তারা গুহায় ঢোকার পর হঠাৎ ভারী বৃষ্টি এবং এতে সৃষ্ট বন্যায় ডুবে যায় গুহামুখ। ভেতরেও ঢুকে পড়ে পানি। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, এই গুহায় কিশোরের দল মাসব্যাপী থাকতে পারবে। তবে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, আবারও বৃষ্টির পানি গুহায় ঢুকে যেতে পারে।

কর্তৃপক্ষ আগে জানিয়েছিল, শত শত সাংবাদিক সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু উদ্ধার অভিযানের জন্য তাদের সরানোটা প্রয়োজন ছিল। তবে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় আশঙ্কা ছিল আবারও বৃষ্টির পানি গুহায় ঢুকে যেতে পারে। তাই দ্রুত তাদের বের করে আনতে এই উদ্ধার অভিযান।

প্রথমে ডুবসাঁতারের মাধ্যমে তাদের বের করে আনার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগ কিশোর সাঁতার জানে না। ডুবসাঁতারের মাধ্যমে কীভাবে ৫-৬ ঘণ্টার কাদাযুক্ত ও অনেক সংকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে তারা বাইরে আসবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে সামান কুনান নামের এক ডুবুরি আটকে পড়া ব্যক্তিদের অক্সিজেন সরঞ্জাম দিয়ে ফেরার পথে মারা যান। ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসও দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে গত শুক্রবার উদ্ধার পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। কিশোরদের কাছে পৌঁছতে গুহার পাহাড়ের পেছনের দিকে অনেকগুলো জায়গায় খনন শুরু হয়। গত শনিবার পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক গর্ত খনন করা হয়। তবে রাতেই আবারও বৃষ্টি হয় এবং আরো বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তাই কর্তৃপক্ষ যা করার গতকালই করার সিদ্ধান্ত নেয়।

তারা যেখানে ছিলেন সেখানে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়েও ছিল উদ্বেগ। কর্মকর্তারা বলেছিলেন, সেখানকার বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ২১ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। তবে উদ্ধারকারীরা তাদের কাছে অক্সিজেনের ১০০টি ট্যাঙ্ক পৌঁছে দেন।

"