শহীদ সাংবাদিকের ছেলের দ্বিখন্ডিত লাশ রেললাইনে

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে ব্যাংক কর্মকর্তা সুমন জাহিদের (৫৭) দ্বিখন্ডিত লাশ উদ্ধার করেছে ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মালিবাগের বাগিচা এলাকার রেললাইন থেকে এই লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে তাকে পরিকল্পিতভাবে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা এটাকে আপাতদৃষ্টিতে এটাকে ট্রেনে কাটা পড়েছেন বলে মন্তব্য করছেন।

এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল তিনজন শিশু। এদের একজনের নাম নার্গিস। সে খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনাস্থল বাগিচা এলাকার রেললাইনের পাশে একটি টঙঘর টাইপের চায়ের দোকান। সকাল ৯টার দিকে সুমন জাহিদ ওই চায়ের দোকানে বসে চা খান। এ সময় দোকানের সামনে খেলারত তিন শিশুর সঙ্গে তিনি কথাও বলেন। প্রায় ১০ মিনিট ধরে তাদের সঙ্গে তিনি গল্প করেন। এরই মধ্যে ট্রেনের হুইসেল শুনতেই তিনি ছুটে যান রেললাইনে। লোহার দন্ডের ওপর গলা রেখে আড়াআড়িভাবে শুয়ে পড়েন। এ দৃশ্য দেখে নার্গিসসহ তিন শিশু ছুটে যায়। নার্গিস তার পা ধরে টেনে আনার চেষ্টা করে। নার্গিস বলেন, আপনি সইরা যান। ট্রেন আইতাছে। তখন সুমন জাহিদ তাদের ধাক্কা দিয়ে সরে দেয়। নার্গিস রেললাইন থেকে নিচে চলে যায়। এ সময় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি দ্রুতগতিতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। রেললাইনের বাইরে সুমন জাহিদের মাথাটি ছিটকে পড়ে। মাথাবিহীন ধর রেললাইনের ভেতর পড়ে থাকে।

ঢাকা রেলপথ থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক মজুমদার বলেন, ঘটনার পর আশপাশের লোকজনের জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। টঙঘরের চায়ের দোকানি নারী বলেছেন, ওই ব্যক্তি নিজেই রেললাইনে শুয়ে পড়েন। এর আগেও ওই ব্যক্তি গত চার দিন ধরে সকালে তার দোকানে চা খেয়েছেন। তাকে খুব চুপচাপ থাকতে দেখা যেত।

তবে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এটাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ। সংবাদপত্র দফতরে পাঠানো এক বার্তায় এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড উল্লেখ করে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। এছাড়া পরিবারও সুমন জাহিদের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পর থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। পুলিশকে জানানোর পর পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চলাফেরারও পরামর্শ দিয়েছিল। মৃত্যুদন্ডে দন্ডিতরাই ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে সুমন জাহিদকে হত্যা করেছে। নিহত সুমন জাহিদ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারে যুক্তরাজ্যে পলাতক চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক আশরাফুজ্জামান উভয়কেই মৃত্যুদন্ড আদেশ দেয়া হয়েছিল।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রেললাইনের স্লিপারের বাইরে পাথরের টুকরাগুলোর ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তিনি হঠাৎ পড়ে যান। ওই মুহূর্তে কমলাপুরের দিক থেকে আসা একটি ট্রেন ঘটনাস্থল অতিক্রম করে। এরপর আশপাশের লোকজন দেখতে পান যে লাইনের ভেতর মাথা পড়ে আছে। মাথাবিহীন দেহ রেললাইনের বাইরে পড়ে আছে।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার এএসআই আনোয়ার হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে ট্রেনে কাটা পড়ে লোক নিহত হওয়ার খবর পাই। ছুটে গিয়ে দেখি এক ব্যক্তির মাথা বিচ্ছিন্ন লাশ। রক্তাক্ত রেললাইনে থেঁতলে আছে মাংস ও চামড়া। আমরা যাওয়ার আগেই লাইনম্যানরা লাশ সরিয়ে পাশে রাখে। পরে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। লাশের পিঠে, মাথায়, মুখের সামনে, গালে ও নাকে আঘাতের চিহ্ন আছে। তবে মনে হচ্ছে শরীর থেকে মাথা আলাদা হয়েছে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে। সুমনকে অজ্ঞান করে রেললাইনের ওপর রেখে গেছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সোহেল মাহমুদ বলেন, হতে পারে। তিনি বলেন, ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন একসঙ্গে করে এরপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তখন নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে মারা গেছেন।

জানা যায়, ১৯৬১ সালে ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন সুমন জাহিদ। ১৯৭১ সালে জাহিদের মা সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনী। পরে স্বাধীনতার দুই দিন পর ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে সেলিনা পারভীনের লাশ উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর নিউ সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে মাকে যখন ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন ছোট্ট সুমন তখন বাড়ির ছাদে খেলছিল। এরপর মাতৃহারা সুমন জাহিদ অনেক সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি কিছু দিন সাংবাদিকতা করেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনে তিনি প্রশাসনিক পদে চাকরি করতেন। পরে ফারমার্স ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। চার মাস আগে ফারমার্স ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন। ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় গ্রাহকরা টাকার জন্য তার ওপর চাপ দিচ্ছিলেন। তারই পরিচিতজনরা ফারমার্স ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন। এ কারণে ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পর পরিচিতরা টাকার জন্য তাকে চাপ দিতে থাকেন। এ কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।

মৃতের শ্যালক কাজী সারোয়ার জানান, ৩১২, উত্তর শাহজাহানপুরে সুমন জাহিদের বাসা। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সেখানে থাকতেন তিনি। যেখানে তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল, বাসা থেকে হেঁটে সেখানে যেতে ৮ থেকে ১০ মিনিট লাগে।

এদিকে সুমন জাহিদের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সদস্যরা বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, এটি একটি নিছক দুর্ঘটনা, না পরিকল্পিত হত্যাকান্ড; সে বিষয়ে দ্রুত তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। এর আগে যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাইয়ের লাশ এ রকম সড়কের ধারে পাওয়া গিয়েছিল। সেটা হত্যাকান্ড ছিল বলে মনে করেন বুলবুল।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বিবৃতিতে আরো বলা হয়, শৈশবে মাকে হারিয়ে সুমন অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টের ভেতর নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সুমনের অকাল মৃত্যুতে তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছে নির্মূল কমিটি।

নির্মূল কমিটির পক্ষে বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি শামসুল হুদা, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, অধ্যাপক অজয় রায়, সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী, লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সাংবাদিক কামাল লোহানী, অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক অনুপম সেন, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী রফিকুন নবী, অধ্যাপক পান্না কায়সার, স্থপতি রবিউল হুসাইন, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী প্রমুখ।

"