কিমের ‘খেলায়’ ধরাশায়ী ট্রাম্প!

নতুন যুগের প্রত্যাশা জাতিসংঘের দ.কোরিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠছে আজ। কিন্তু এর আগেই সিঙ্গাপুরে হয়ে গেল আরেক মহা ‘শো’। রাশিয়ায় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ শুরুর মাত্র দুই দিন আগের এই ‘শো’ নিয়ে গত মঙ্গলবার পুরো বিশ্বেরই নজর ছিল সিঙ্গাপুরে। দেশটির সেন্তোসা দ্বীপে কূটনীতির ‘হাইভোল্টেজ ম্যাচ’ নিয়ে সবার মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। কারণ, এই খেলায় মুখোমুখি হয়েছিলেন বিশ্বের দুই খ্যাপাটে খেলোয়াড়। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। এই খেলায় কিমের ‘গোলে’ ট্রাম্প ধরাশায়ী হওয়ার খবর দিয়েছে সংবাদ মাধ্যমগুলো। এদিকে, ট্রাম্প-কিমের বৈঠকের পর আশাবাদী হয়ে উঠেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের কোরীয়-আমেরিকানরা। এশিয়ার বাইরে এখানেই সবচেয়ে বেশি কোরীয় বাস করে। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে আশার সূচনা হলো। এটা উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দিকে নিয়ে যাবে। ৫৯ বছর বয়সী প্রকৌশলী কোয়াং উন বলেন, বৈঠকটি শান্তির পথে ‘প্রথম ধাপ।’ আমি উচ্ছ্বসিত। আশা করছি ধীরে ধীরে দুই কোরিয়া আবার একসঙ্গে বাস করবে। আমরা একই জাতি, একই ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষ।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের মতো একনায়কের বৈঠককেই উত্তর কোরীয় নেতার জন্য একটা বিজয় হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। নানা নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে বিলাসবহুল ক্যাপেলা হোটেলে ঐতিহাসিক বৈঠকের আগে-পরে ট্রাম্প ও কিমকে বেশ হাস্যোজ্জ্বলই দেখা গেল। তাদের হাসি হাসি মুখ দেখে সাধারণের বোঝার উপায় নেইÑ বেঠকে কে জয়ী আর কে বিজিত! এই যখন অবস্থা, তখন ‘মুখরা’ ট্রাম্প যথারীতি তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কালবিলম্ব না করে নিজের ‘সাফল্যের’ ঢোল নিজেই পেটালেন। কিমের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যৌথ চুক্তিকে ‘অসাধারণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। তবে এই চুক্তির সারবস্তুতে ঘাটতি রয়েছে বলে ইতোমধ্যে মত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।

নতুন যুগের প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের : ট্রাম্প-কিমের বৈঠককে টেকসই শান্তি অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক জানিয়েছেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও নর্থ কোরিয়াকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে জাতিসংঘ। বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

সংস্থাটির পররাষ্ট্র-বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মোঘেরিনি বলেছেন, কূটনৈতিকভাবেই আঞ্চলিক শান্তি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য সাউথ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। অভিনন্দন জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ কানাডা, রাশিয়া, ফ্রান্স, রাশিয়া ও বিশ্বের অনন্য রাষ্ট্র প্রধানরা।

নিষেধাজ্ঞা ‘তুলে নেবেন ট্রাম্প’ : সিঙ্গাপুরে কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মতি দিয়েছেন। গতকাল বুধবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ-এর এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানীয় বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য ও দেশটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটির সদস্যরা ‘যুদ্ধ মহড়া’ নামে পরিচিত এই সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে থাকেন। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী এ সামরিক ঘাঁটিতে সার্বক্ষণিকভাবে প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য থাকে বলে ধারণা করা হয়।

পিয়ংইয়ং শুরু থেকেই এ ধরনের সামরিক আয়োজনকে ‘আগ্রাসনের প্রস্তুতি’ অভিহিত করে বার্ষিক এ মহড়া বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল।

অন্যদিকে, বৈঠক নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ পত্রিকাও আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। যদিও একটি রক্ষণশীল পত্রিকা দুপক্ষের চুক্তিকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যায়িত করেছে। চোসান পত্রিকা-এর সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘চুক্তিটি এতটাই অসংগত ও অযৌক্তিক যে, আমাদের বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে।’ পত্রিকাটি উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়া বালিতের প্রতিশ্রুতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

কিন্তু হ্যাংকিওরেহ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এই বৈঠকের প্রশংসা করা হয়েছে। তারা একে ‘মহৎ পরিবর্তনের’ নতুন অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

সংবাদ মাধ্যমের খবরে এসেছে, ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের মতো একনায়কের বৈঠককেই উত্তর কোরীয় নেতার জন্য একটা বিজয় হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

বাণিজ্যবান্ধব জুংগ্যাং পত্রিকা অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। পত্রিকাটি জানায়, পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের জন্য সময়সীমা বেধে দেওয়া না হলেও এই বৈঠক আশার আলো দেখিয়েছে।

জুংগ্যাং জানায়, ‘আমরা এই বৈঠককে ব্যর্থ বলতে পারি না। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। দুই বৈরী নেতার মধ্যে বৈঠক হয়েছে। এটি কয়েক দশক ধরে চলা বৈরিতা অবসানের প্রথম ধাপ।’

এদিকে, ডেমোক্র্যাট শিবিরে ইতোমধ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। তারা বলছে, ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বলে গলা ফাটিয়ে আসছেন। এখন তার নমুনা দেখা যাচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম রাষ্ট্রকে বুকে টেনে নিয়েছেন। কিম যে চরম স্বৈরাচারী এক শাসক, এ কথা কার না জানা! অথচ তারই প্রশংসায় পঞ্চমুখ ট্রাম্প। কিমের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে ট্রাম্প অনেক ছাড় দিয়েছেন। তিনি উত্তর কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে তুলে এনেছেন। উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। কিন্তু ট্রাম্প-কিম বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচিতই হয়নি।

অন্যদিকে, ট্রাম্প কোরিয়ায় সামরিক মহড়া বাতিলের ঘোষণা দিলেও ‘লৌহবর্ম’ নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিতে অবিচল থাকার ব্যাপারে মিত্রদের আশ্বস্ত করেছে পেন্টাগন। দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, তারা ট্রাম্পের ঘোষণার ‘সত্যিকারের অর্থ ও উদ্দেশ্য’ খতিয়ে দেখছে।

"