গণশুনানিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা

গ্যাসের চুরি কমলে দাম বাড়াতে হবে না

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়। অন্যদিকে, বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হচ্ছে। চুরির গ্যাস বন্ধ করা গেলে এলএনজি আমদানি করতে হবে না। আর এলএনজি না এলে গ্যাসের দাম বাড়ানোরও প্রয়োজন পড়বে না। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে তিতাসের দেওয়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানিতে এ কথা বলেছেন বক্তারা।

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাস কোম্পানি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল ২৪০ শতাংশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি ১৪৩ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। রান্নার জন্য ব্যবহৃত আবাসিকের চুলা ও বাণিজ্যিক ছাড়া সব ধরনের গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শুরু করেছে বিইআরসি।

শুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষে বলা হয়, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন মতে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়। অন্যদিকে, বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হচ্ছে। গ্যাস চুরি বন্ধ করা গেলে এলএনজি আমদানি করতে হবে না। আর এলএনজি না এলে গ্যাসের দাম বাড়ানোরও প্রয়োজন পড়বে না।

এবার দাম বৃদ্ধির বাইরে থাকছে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা। অন্যদিকে, দাম বাড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্যাপটিভ পাওয়ার (শিল্পের বিদ্যুৎ), সার কারখানা, শিল্প উৎপাদন ও সিএনজি গ্রাহকদের। শুনানিতে কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য রহমান মুর্শেদ, মাহমুদুল হক ভূঁইয়া, মো. আবদুল আজিজ খান, মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

কমিশন বলছে, এখন নির্দিষ্ট শ্রেণির এসব গ্রাহক গড়ে ৩ দশমিক ৪৪৯৩ টাকায় প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কিনে থাকে। সব ধরনের তহবিল এবং চার্জ ধরে এই গ্যাসের ঘনমিটারপ্রতি ১১ দশমিক ৭৪৪৩ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে তিতাস। কারিগরি কমিটি মনে করছে, এই দর ৮ দশমিক ৪০৫২ টাকা রাখলেই তিতাসের কোনো লোকসান হবে না।

শুনানিতে অংশ নেওয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রতিনিধিরা জানান, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বছরে আট হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হবে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থের জোগান ঠিক রাখতে বাড়াতে হবে বিদ্যুতের দাম।

গণশুনানিতে অংশ নেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন আব বাংলাদেশ (ক্যাব), জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নেই। গ্যাস খাতের অনিয়ম দুর্নীতির কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যাংক লুটের মতো গ্যাস খাতেও লুটপাট হয়েছে।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, গ্যাস-সংযোগ সরকার বন্ধ করে রেখেছে নির্বাহী আদেশে। তবে শিল্প-কারখানায় গ্যাস-সংযোগ দেওয়ার জন্য জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহীকে প্রধান করে গ্যাস-সংযোগ একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি কয়েক হাজার শিল্পে সংযোগ দিয়েছে। এ কারণেই এখন গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এই বেআইনি কমিটি গ্যাস খাতকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ (তলাবিহীন ঝুড়ি) বানিয়ে ফেলেছে।

তিনি বলেন, তিতাস আটটি প্রকল্পে ২ শতাংশ হারে ২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে তিতাস মগনমাতে বিদেশি কোম্পানি সান্তোসের সঙ্গে বাপেক্সকে যৌথভাবে কূপ খনন করার জন্য ১৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অথচ সেখানে কোনো গ্যাস পাওয়া যাবে না সেটা আগেই জানা ছিল। ফলে এই ১৩০ কোটি টাকা তিতাস ফিরে পাবে কি না সন্দেহ। বিইআরসির অনুমতি না নিয়ে তিতাসের ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি অনিয়ম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক বদরুল ইমাম বলেন, গত ২০ বছরে গড়ে ২০টি কূপও খনন করা হয়নি। অথচ সারা দেশে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাগরেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এভাবে ধীরে ধীরে গ্যাসের সংকট তৈরি করা হয়েছে। এখন বেশি দামে এলএনজি আমদানি করে এই অজুহাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়িয়ে স্থল ও সাগরভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিতাসের গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আবাসিকে রান্নায় ব্যবহৃত চুলা ও বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে না। এর বাইরে সব খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো প্রয়োজন।

শুনানিতে বুয়েটের অধ্যাপক নূরুল ইসলাম বলেন, এলএনজি আসছে এই খবরেই গৃহস্থালির গ্রাহকদের ডিমান্ড নোট ইস্যু করা হচ্ছে। আবার একটি মহল এ বিষয়ে তৎপর হয়েছে।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মীর মশিউর রহমান বলেন, নতুন করে কাউকে ডিমান্ড নোট দেওয়া হয়নি। আগের যাদের ডিমান্ড নোট ইস্যু করা হয়েছে, গৃহস্থালিতে সংযোগ দিলে তাদের আগে দেওয়া হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে ঘোষণা দিতে হবে। এখনো তিতাস গৃহস্থালিতে গ্যাস দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দেশনা পায়নি।

শুনানিতে আরো বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মী।

"