রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে প্রাণ গেল ১১ জনের

উখিয়া টেকনাফে রোহিঙ্গাদের আরো ২০০ ঘর বিধ্বস্ত হ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তিন পার্বত্য জেলায়

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

টানা বৃষ্টির মধ্যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে গোটা পাহাড়ি এলাকায়। রাঙামাটির নানিয়ারচরেই পাহাড়ধসে ১১ জনের মৃত্যুর হয়েছে। ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গাদের প্রায় ২০০ ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এতে দুই শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে; আংশিক বন্ধ রয়েছে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির কারণে রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে গতকাল মঙ্গলবার সকালে ১১ জন মারা গেছে। ঠিক এক বছর আগের দিনেই রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছিল। এদিকে টানা বৃষ্টির মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ধস, ফাটল ও গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে রাঙামাটিতে। মাইকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যেতে বললেও সাড়া মেলেনি; বরং আতঙ্ক বেড়েছে আরো বেশি।

গত বছরের ভয়াবহ ধসে ১২০ জন মারা যায়। সেই পরিবারগুলো এখনো কাঁদছে। তবে নানিয়ারচরে কেউ মারা যায়নি। ওই ধসের পর জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের যে তালিকা করেছেন তাতে নানিয়ারচর উপজেলার চার ইউনিয়নে ২৩৯ পরিবারের ১ হাজার ১১১ জনকে রাখা হয়। উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোয়ালিটি চাকমার বরাত দিয়ে রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, উপজেলার বড়পুল পাড়ায় দুই পরিবারের চারজন, ধর্মচরণ কারবারি পাড়ায় একই পরিবারের চারজন, হাতিমারা এলাকায় দুইজন এবং গিলাছড়ি ইউনিয়নের মনতলা এলাকায় একজন মারা গেছেন।

শহরের শিমুলতলি এলাকার মুদি দোকানি নূর মোহাম্মদ বলেন, বৃষ্টি দেখলেই ভয় লাগে। মনে হয় যেন গত বছরের মতো হবে। বৃষ্টির কারণে সারা রাত নির্ঘুম ছিলাম। এই আতঙ্ক আরো বেড়ে যায় বিদুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে।

জেলা বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কান্তি মজুমদার জানান, টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপাকে পড়েছে।

শহরের চম্পকনগর, আনসার ক্যাম্প, উন্নয়ন বোর্ড এলাকাসহ কয়েক জায়গায় সড়ক ও ভবনের পাশের মাটি সরে যাওয়া এবং রাস্তার ওপর গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়।

ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা গাছ কেটে সরিয়ে নিলে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয় বটে, আতঙ্ক পিছু ছাড়ে না টানা বৃষ্টির কারণে।

গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্কতামূলক পোস্ট দিয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন অনেকে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে।

জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, চারদিক থেকে ভয়াবহ আতঙ্ক আর টানা বৃষ্টির কারণে আমিও ঘরে বসে থাকতে পারিনি। রাতে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তড়িৎ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সকাল থেকে রাত অবধি মাঠেই আছেন। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেব।

গত বছরের ১৩ জুন রাঙ্গামাটিতে সংগঠিত হওয়া ভয়াবহ পাহাড়ধসে বাসনা দাশ হারান তার মেঝ ছেলে লিটন দাশ (৩২), ছেলের স্ত্রী চুমকি দাশ (২১) এবং তাদের একমাত্র সন্তান আয়েশ দাশকে (০২)। ছেলে ও তার পরিবারকে হারিয়ে বাসনা দাশ এখন প্রায় নিষ্প্রাণ। তার স্বামী গোপাল চন্দ্র দাশ মারা যান অনেক আগেই। তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিলো তার বসবাস। তিন ছেলের মধ্যে মেঝ ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে পাহাড়। দুই ছেলে নিয়ে এখনো আগের জায়গায় বাস করছে বাসনা। মেজ ছেলে লিটনকে বিয়ে করিয়েছিল ৪ বছর আগে, সেই ঘরে ছিল তার দুই বছরের আদরের নাতি আয়েশ।

তিনি বলেন, আমার এ ছেলেটা ছিল মায়ের জন্য কলিজার একটি অংশ। আমার কিছু হলে সে কখনো শান্তিতে থাকতে পারত না। সারাক্ষণ মা মা বলে ডাকত। কত দিন হয় আমার ছেলেটার মুখে মা ডাক শুনি না।

সালাউদ্দিন ও রহিমা বেগমের আদরের দুই মেয়ে জেসমিন আক্তার মিম (৭) ও সুমাইয়া আক্তার (২)। দুই মেয়েকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন তারা। গত বছরের ১৩ জুন পাহাড়ধসে রূপনগর এলাকায় নিখোঁজ হন এই স্বামী-স্ত্রী। এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি তাদের লাশ। এই দুই বোন তাদের চাচা মোহাম্মদ কাউছার ও ফুফু রিনা আক্তারের সঙ্গে বাস করছে।

রাঙ্গামাটি শহরের নতুন পাড়ার বাসিন্দা নবী ড্রাইভার। গত বছরের ১৩ জুন ভোর রাতে সাহ্রি খেয়ে নামাজ শেষে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলেন, যেকোনো সময় পাহাড়ধস হতে পারে, সবাই নিরাপদ স্থানে চলে যান। পরে হঠাৎ বাড়ির পাশের পাহাড়ধসে পড়ে তাদের ওপর। এতে ঘটনাস্থলে মারা যায় নবী ড্রাইভারের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, নাতনি ও ছেলের বউ।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণে টেকনাফের হোয়াইক্যং পটুবনিয়া, সালবাগান, লেদা ও মৌচনি রোহিঙ্গা শিবিরে পানি প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে অনেক ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ভেঙে গেছে। এছাড়া উখিয়ার বালুখালী, জামতলী ও মধুরছড়া শিবিরে অর্ধশতাধিকের মতো রোহিঙ্গা পরিবারের ঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে এসব শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

গত ৮ মাস আগে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন আবদুর রহিম। তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় আমরা খুব বিপাকে পড়েছি। পাহাড়ে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে আগেই। এর মধ্যে আমার ঘরও রয়েছে। পরিবারের আট সদস্য নিয়ে এখন কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।’

হোয়াইক্যং পটুবনিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা আবদুল হামিদ বলেন, পাহাড়ের পাশে থাকা শতাধিক রোহিঙ্গার ঘর ভেঙেছে। তারা এখন আশ্রয়ের জায়গা খুঁজছে।

উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বৃষ্টিতে দুপুর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা শিবিরের অনেক ঘর বিধ্বস্ত ও পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছি। তালিকা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে; আংশিক বন্ধ রয়েছে বান্দরবানের সঙ্গেও।

হাইওয়ে পুলিশ নাজিরহাট ফাঁড়ির কর্মকর্তা মুজিবর রহমান বলেন, প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে বুক সমান পানি হয়েছে, যার কারণে দুই দিক থেকেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নাজিরহাট মাইজভান্ডার সড়ক, গহিরা হোয়াকো সড়ক, ফটিকছড়ি কাজীর হাট সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে হাঁটু থেকে বুক সমান পানি হয়ে গেছে। বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত পানি কমারও সম্ভাবনা নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনেও পানি উঠেছে বলে জানান চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, হাসপাতালের নিচতলা পানির নিচে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সাপে কাটা চার রোগীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন জানান, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি উঠায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সড়কের পাশাপাশি ব্রিজ কালভার্টও ভেঙে গেছে।

সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোবারক হোসেন জানান, বাজালিয়া এলাকায় পানি উঠায় বান্দরবান-চট্টগ্রামে সড়কে কোনো ছোট গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পানি উঠলেও আমিলাইশ, চরতি, নলুয়া ইউনিয়নের মানুষ পুরোপুরি পানিবন্দি।

"