অভিযানের মধ্যেই মাদকের কারবার!

ইয়াবার অর্ডার বেশি অনলাইনে * দাম বেড়ে তিন গুণ * চালান স্থানান্তরে নারী-শিশু

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। তবু যেন কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চলতি মাসে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী যে অভিযান শুরু হয়েছে, তাতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। চলমান অভিযানে প্রায় দেড়শ মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন। কিন্তু অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই মাদকের কারবার।

রাজধানীসহ দেশের চিহ্নিত প্রায় প্রতিটি মাদক স্পটেই অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব স্পটে অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন অনেকে। গ্রেফতার হয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি মাদক কারবারি। একটি স্পটে অভিযানের দু-এক দিন পরই সেখানে আবারও মাদকের বেচাকেনা শুরু হচ্ছে। তবে অভিযানের পর মাদক বেচাকেনায় কৌশল পাল্টেছে কারবারিরা। নির্দিষ্ট ও বিশ্বস্ত খদ্দের ছাড়া মাদক ডেলিভারি দিচ্ছেন না তারা। প্রয়োজনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অগ্রিম পেমেন্টও নেওয়া হচ্ছে। অনলাইনেও চলছে মাদকের কারবার।

ঢাকঢোল পিটিয়ে গত ২৬ মে রাজধানীর অন্যতম মাদক স্পট কড়াইল বস্তিতে অভিযান চালানো হয়। এরপরও মাদক বিক্রি বন্ধ হয়নি। নানা কৌশলে বাহকের মাধ্যমে মাদকসেবীর কাছে তা পৌঁছে যাচ্ছে। মাদক বহনে এখন নারী ও শিশুদের বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। মৌসুমি ফল আম ও শাড়ির ভেতরে ভরে নারী ও শিশুরা ইয়াবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।

শুধু কড়াইল বস্তি নয়, রাজধানীর আরো তিনটি বড় মাদক স্পট মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, তেজগাঁও রেললাইন বস্তি এবং পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্প ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। সাঁড়াশি অভিযানে হোতারা ধরা না পড়ায় মাদক বেচাকেনাও বন্ধ হচ্ছে না। যদিও এখন আর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয় না। তবে সন্ধ্যা নামলেই কড়াইল বস্তি এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ে। যাদের অধিকাংশই ইয়াবার নিয়মিত ক্রেতা। ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুরা মোবাইল ফোনে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সুযোগ বুঝে আড়ালে গিয়ে মাদক সরবরাহ করে।

গত ২৬ মে মোহাম্মদপুরে বিহারিদের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল জেনেভা ক্যাম্পে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানের পর প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি কমেছে। আগে অপরিচিত কাউকে দেখলে মাদক কেনার ‘অফার’ দিত। এখন অপরিচিতদের দেখলেই সতর্ক হয়ে যায় কারবারিরা। তবে মাদক বিক্রি থেমে নেই। ক্রেতাদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে ক্যাম্পের বাইরে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্যাম্পের গডফাদাররা ধরা না পড়ায় কারবার চলছেই। ঝুঁকি মোকাবিলায় বিহারি শিশুদের ব্যবহার করছেন কারবারিরা। ক্যাম্পের মূল নিয়ন্ত্রক ইশতিয়াক বাইরে থেকেই ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণ করছেন।

এদিকে, গত ২৭ মে তেজগাঁও রেললাইন বস্তিতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানের পর মাদক বেচাকেনায় এখনো চলছে। তবে কৌশল পাল্টেছে কারবারিরা। এ স্পটে ইয়াবার চেয়ে গাঁজার বেচাকেনা বেশি। অভিযানের কারণে গাঁজার রেটও বেড়েছে। আগে এক পুরিয়া গাঁজা ৩০ টাকায় বিক্রি হতো, সেটি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। আর ২০০ টাকার ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়।

অন্যদিকে গত ২ জুন পল্লবীর বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্পে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালায়। অভিযানের পরদিন কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায় সেখানে মাদক বিক্রি বন্ধ হয়নি। অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা খবর পেয়ে পালিয়ে যান। পরে আবার তারা স্পটে ফিরে মাদক বিক্রি করছেন। ১১ নম্বরের তালতলায় কাল্লুর গাঁজার স্পট এবং খালার মদের স্পটে এখনো মাদক বিক্রি হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ১০ নম্বর ঝুটপট্টিতে রাজীবের স্পট, কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে মুকুলের স্পট ও বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় হারুনের স্পট ও পাপিয়ার স্পটে মাদক বিক্রি হচ্ছে।

অনলাইনে মাদকের নিরাপদ হাট : বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে নিত্য ব্যবহারের জিনিসপত্র থেকে শুরু করে গবাদিপশু, গাড়ি, বাড়ি সবই কেনা যাচ্ছে অনলাইনে। অনলাইন শপিংয়ের এ সময়ে বাদ পড়ছে না মাদকও। অনলাইনে অর্ডার দিলে অন্যান্য পণ্যের মতোই বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবা। হোম ডেলিভারির এই সুযোগ লুফে নিচ্ছেন তরুণ মাদকসেবীরা। মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের অসংখ্য গ্রুপ রয়েছে ফেসবুক-টুইটার ও ইউটিউবে। এ ছাড়াও তারা ভাইবার, ইমো ব্যবহার করে নির্বিঘেœ চলছে মাদক কেনাবেচা। নিরাপত্তার জন্য সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে। মাদক বিক্রির ভার্চুয়াল হাটেও হানা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা। তবে অনলাইনে মাদক বেচাকেনায় নজরদারি ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এর ভয়াবহতা আরো বাড়বে; যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণে মুশকিল হয়ে উঠবে।

গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে নানা কৌশলে ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে ইয়াবার চালান। বহনকারীদের শরীরে বিশেষ ডিভাইস বেঁধে দিয়ে আত্মগোপনে থেকে ওই ডিভাইসের মাধ্যমে বহনকারীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন মাদক ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে এমন সব কায়দায় ইয়াবার চালান বহন করা হয়, যা বহনকারীর জন্য মৃত্যুঝুঁকিও থাকে। বিশেষ করে শিশুদের পাকস্থলীতে করে ইয়াবা আনা হচ্ছে।

গত ৪ জুন যাত্রাবাড়ীতে নামাজের জায়গায় ইয়াবা বেচাকেনার সময় ২৮ হাজার ইয়াবাসহ কোরআনে হাফেজ শহিদুল্লাহসহ চারজনকে গ্রেফতার করে ডিবি। এর আগে ২৭ মে দক্ষিণখান থেকে এক রোহিঙ্গা শিশু ও তার চাচা সেলিম মোল্যাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। রোহিঙ্গা চাচা-ভাতিজার পেট থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ইয়াবা বের করা হয়। টেকনাফ থেকে আসার পর বহনকারীদের মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়াম ওষুধ খাইয়ে পেট থেকে মলের সঙ্গে ইয়াবার পোঁটলা বের করা হয়। এভাবেই ইয়াবা পাচার চলছে।

মাদক পাচারের যত কৌশল : দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করে অভিনব কৌশলে রাজধানীতে মাদকের চালান আনা হচ্ছে। ইদানীং মাদক পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার বেড়েছে। নারকেল, বার্মিজ জুতা, মিষ্টিকুমড়া, অ্যাম্বুলেন্স, কুরিয়ার সার্ভিস, সবজি ও ফসলের ট্রাক, গাড়ির বডি ও চেসিস, কফিন, তেলের ড্রাম, প্লাইউডের ভেতরে করে ইয়াবা আনা হচ্ছে। এ ছাড়া নারী-পুরুষের সংবেদনশীল অঙ্গেও আনা হচ্ছে ইয়াবা। তবে ফেনসিডিল বেশির ভাগ আসছে প্রাইভেট কার কিংবা বড় গাড়িতে। কম্পিউটার মনিটর, সিপিইউ, ব্যাটারি, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাছের পোনা বহনকারী ড্রামের ভেতরে মাদকদ্রব্য বহন করা হয়। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সাংবাদিক, প্রেস, সংবাদপত্র ও মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো গাড়ি ছাড়াও নানা কৌশলে চলছে মাদক পাচার।

"