নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সিপিডি

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আয়-ব্যয়ের যে লক্ষ্য ঠিক করেছেন, তাতে উচ্চবিত্ত সুবিধা পেলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়বে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। শুক্রবার বাজেট পরবর্তী পর্যালোচনায় বেসরকারি এ গবেষণা সংস্থার সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামগ্রিক বিবেচনায় তাদের মনে হয়েছে, ‘নবীন বাংলাদেশের জন্য একটি প্রবীণ বাজেট তৈরি করা হয়েছে।’

সিপিডি বলছে, এবারের বাজেটের ভালো দিক হলো ধনীদের সম্পদের ওপর সারচার্জ বাড়ানো, স্থানীয় শিল্পের প্রসারে নীতিসহায়তা, প্রতিবন্ধীবান্ধব হাসপাতালের সুবিধা, গরিবের রুটি-বিস্কুট ও পাদুকার ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) তুলে নেওয়া ইত্যাদি। সিপিডি মনে করছে, ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত, ব্যাংকের করপোরেট কর কমানোর সুফল সুদের হার ও তারল্য সংকটের ওপর প্রভাব ফেলবে না। উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড সেবা ও ই-কমার্স ব্যবসার ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে তরুণদের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে তা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যয়

বাড়াবে। তামাকজাত পণ্য রফতানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে দেওয়ার সমালোচনা করেছে সিপিডি। তারা মনে করছে, এটা করা হলে দেশে তামাক উৎপাদন বাড়বে, যা সরকারের তামাক উৎপাদন বন্ধ করা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্র্যান্ডের পোশাক ও আসবাবের ওপর এবং আমদানিতে উৎসে ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে। তবে এ সিদ্ধান্ত অর্থমন্ত্রী ভ্যাটের হার সমন্বয়ের জন্য নিয়েছেন বলে সিপিডি মনে করে।

বাজেটের লক্ষ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় বলেন, ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বাজেটে বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা পূরণ করতে হলে ১১৭ হাজার কোটি টাকা বাড়তি লাগবে, যা ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ করতে হবে।

আর তাতে করে ‘পুঁজির উৎপাদনশীলতা কমে যাবে’ বলে মন্তব্য করেন সিপিডিরি এই ফেলো।

তিনি বলেন, ‘ধরা হয়েছে যে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থাকবে, আমরা অবশ্যই এটার ব্যাপারে গভীর সংশয় প্রকাশ করছি। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির যে পরিস্থিতি এবং দেশের ভেতরে যে প্রবণতা সেটা এটাই বলছে।’

প্রবৃদ্ধির অঙ্কের বদলে সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবন মানে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে- সে দিকে নজর বাড়ানোর তাগিদ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

‘আমরা বার বার বলেছি যে, বিড়াল বড় হতে পারে, বিড়াল ছোট হতে পারে কিন্তু তাকে ইঁদুর ধরতে হবে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার উঁচু হতে পারে, প্রবৃদ্ধির হার নিচু হতে পারে, কিন্তু প্রবৃদ্ধিতে গরিব মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন হতে হবে, তাদের বেশি পেতে হবে।’

‘কিন্তু আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে পূর্ব-পশ্চিম ভাগ তৈরি হয়েছে। এক দিকে সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা; অপরদিকে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী। একদিকে উন্নততর বাংলাদেশ, আরেকদিকে দরিদ্রতর বাংলাদেশ। আমরা দেখছি, সম্পদ, ভোগ এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে।’

অর্থনীতির এই গবেষক বলেন, ‘যারা সবচেয়ে গরিব, গত পাঁচ বছরে তাদের ৬০ শতাংশ আয় কমেছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ মানুষের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ আয় বৃদ্ধি ঘটেছে।

এখানে যার পুঁজি আছে, তারা আয় করার বেশি সুযোগ পাচ্ছে যার শ্রম ও উদ্যোগ আছে তার তুলনায়। শ্রম ও উদ্যোগের তুলনায় পুঁজি এবং সম্পদকে বেশি পুরস্কৃত করছেন। এটা মেধাভিত্তিক অর্থনীতির জন্য ভালো খবর বলে মনে হচ্ছে না।’

দেবপ্রিয় বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রেমিটেন্স, রফতানি আয়, মুদ্রাস্ফীতি ও সামাজিক সুরক্ষার জায়গাগুলোকে দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী দিক। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় ও এডিপি বাস্তবায়নে দুর্বলতা, কৃষকের প্রণোদনামূলক দাম না পাওয়া, বৈদিশিক আয়-ব্যয়ে চাপ ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিকে তিনি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।’

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ এখনো স্থবির হয়ে রয়েছে। কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির হার এবং গরিবের আয় বৃদ্ধির হার দুর্বল, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের গুণগত মান দুর্বল। এ কারণ বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

বাজেটে ব্যক্তিখাতে করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানোয় হতাশা প্রকাশ করে দেবপ্রিয় বলেন, ‘আনুতোষিক ব্যয়ে ৭৫ লাখ টাকা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সেটা উচ্চবিত্তের মানুষরা পাবেন। এটা আমাদের কাছে বৈষম্যপূর্ণ মনে হয়েছে। যখন নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে সুবিধা দিলাম না, কিন্তু উচ্চবিত্তকে আনুতোষিক ব্যয়ে সুবিধা দিচ্ছি, এটা অর্থনীতির সাম্যনীতিতে ঠিক হলো না।’

অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যমান ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করেছেন। আর অনিবন্ধিত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স বিদ্যমান ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন।

এর বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে যে ধরনের নৈরাজ্য চলছে, সেটা সমাধান না করে এ ধরনের সুবিধা দেওয়া- আগে যেভাবে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটাকে ধরে রাখা হয়েছে। এর ফলে তারল্য বাড়বে না বলেই আমাদের সন্দেহ।’

"