দেশে কোনো অভাব নেই

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজেকে দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘আমার প্রতিটি বাজেটই নির্বাচনি বাজেট। কারণ আমি একটি দলের শুধু সদস্য নই, গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দলের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখি। তাই আমার প্রতিটি বাজেটই রাজনৈতিক বাজেট হবে, এটাই স্বাভাবিক।’ বাজেট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যাতে স্বস্তিতে থাকেন, মানুষ যা পছন্দ করে, বাজেট দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই চিন্তা সব সময় কাজ করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরো বলেছেন, দেশের কোথাও অভাব বলে আর কোনো শব্দ নেই। মঙ্গাকে চির বিদায় দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শুক্রবার ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম. এ. মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোসলেম চৌধুরী প্রমুখ।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ। এক সময় দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশ। এই কিছুদিন আগেও দেশে ৩০ শতাংশ মানুষ ছিল গরিব। ৭ বছর আগে সাড়ে ৩০ শতাংশ দরিদ্র ছিল, আজ ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। যারা চূড়ান্ত গরিব, তাদের সংখ্যা ছিল ১৮ শতাংশ। এখন সেটা ১১ শতাংশ। দেশে আয় বৈষম্য বাড়ছে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে আয় বৈষম্য মোটেও বাড়েনি। যারা পরিবর্তনে বিশ্বাস করে না, তারাই এ ধরনের প্রশ্ন করেন। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘কোন মুখে আপনারা বলেন, এই দেশে গরিব মারার বাজেট হচ্ছে, ধনীকে তেল দেওয়ার বাজেট হচ্ছে।’ সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে মুহিত ইংরাজিতে বলেন, ‘আপনারা বাজেট ভালোভাবে পড়ে দেখেননি। আপনারা কোনোভাবেই বাজেটের সমালোচনা করতে আসেননি। আপনাদের কিছু গৎবাঁধা প্রশ্ন উপস্থাপন করতে এসেছেন।’ অবশ্য সংবাদ সম্মেলনের শেষের দিকে এসে এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একটু আগে যে জন্য ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম, কারণ আমার কাছে এসব প্রশ্ন অমূলক ও বাস্তবতা বিবর্জিত মনে হয়েছে।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এক সময় বিশ্ব আমাদের ভিক্ষুক বলত। এখন আর সেটা কেউ বলে না। এখন বলছে, বাংলাদেশ হলো উন্নয়নের মডেল। সেই উন্নয়নের মডেল যে দেশ, সে দেশের সম্পর্কে দারিদ্র্য বিমোচনের প্রশ্নÑ একেবারে অমূলক। একেবারেই বাস্তবতা বিবর্জিত। সেই কারণে আমি একটু ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম।

একটি পত্রিকায় ‘ভুয়া বাজেট’ শিরোনাম হয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যারা নির্বোধ ও যাদের দেশপ্রেম নেই, তারাই বলে ভুয়া বাজেট।’ এক প্রশ্নের জবাবে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্তমান সরকারের সময়ের মতো সুযোগ-সুবিধা আগে কখনো পাননি। যারা ৪০ হাজার টাকা বেতন পেতেন তারা এখন পাচ্ছেন ৭৮ থেকে ৮০ হাজার টাকা। তাছাড়া পেনশনের অবস্থা ভালো এবং ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমার মনে হয় না, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন যিনি আরো সুযোগ-সুবিধা চান।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেকেই এই বাজেটকে নির্বাচনি বাজেট বলছেন। এবার নির্বাচনি হাওয়া একটু দেরিতেই লাগছে। যেহেতু এখনো নির্বাচনের হাওয়া শুরু হয়নি, নির্বাচনের বছরের বাজেট বাস্তবায়ন তাই ততটা খারাপ হবে না বলে মনে হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমস্যা হবে না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। অনেক ধরনের ঘাটতি ও সমস্যকে বিবেচনায় নিয়ে বাজেট তৈরি করি এবং বাস্তবায়নও করি। এবারের বাজেটে আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, সেটা ঠিকই আছে এবং আশা করি কোনো সমস্যা হবে না।’ বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার ঘোষণা দিয়েছি।

মুহিত বলেন, বাংলাদেশে গুণগত যে পরিবর্তন হয়েছে- ১৯৭১ সালের দেশ আর আজকের এই দেশ এক নয়। দেশটি এখন যথেষ্ট একটি উন্নত দেশ। গ্রামে-গঞ্জে লোকজন সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘সুশাসন ও দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়া দুইটি প্রক্রিয়াই বেশ লম্বা। এটা খুব সহজে ও খুব তাড়াতাড়ি হয় না। তবে তথ্য-প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করছি। প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দুর্নীতি করার সুযোগ নেই।’

তিনি বলেন, এবারের বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা রাখছি। তবে আমরা আশা করছি, এই টাকা তাদের জন্য খরচ করতে হবে না। কারণ বিদেশ থেকে তহবিল আসছে। সেটা দিয়েই হয়ে যাবে।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং সেক্টর অনেক বড় হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকিং সার্ভিস সে রকম প্রসারিত হয়নি। তাই এই খাতের জন্য আদূর ভবিষ্যতে একটা ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা চিন্তা করেছিলাম। ব্যাংকিং কমিশন আমি করছি না। ব্যাংকিং কমিশন করার সমস্ত কাগজপত্র তৈরি করে রেখেছি। এটা পরবর্তী সরকারের কাছে দিয়ে যেতে চাই। পরবর্তী সরকার কে হবে তার ওপর নির্ভর করবে ব্যাংকিং সংস্কার কী রকম হবে।’

সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানোর বিষয়ে মুহিত বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজেটের পরের মাসেই সমন্বয় করা হবে। সাধারণত দুই তিন বছর পরপরই আমরা সুদহার সমন্বয় করি। কিন্তু এবার একটু দেরি হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘অনলাইনে (ই-কমার্স) কেনাকাটায় ক্রেতাকে কোনো মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হবে না। তিনি বলেন, ভার্চুয়াল বিজনেস যেমন ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলের ওপর ট্যাক্স ধার্য করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছি। কিন্তু অনলাইন বিজনেসকে আমরা আলাদা রেখেছি। এটার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট রাখা হয়নি।’

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় বেড়েছে। এই পণ্য বা সেবার পরিসরকে আরো বাড়াতে ভার্চুয়াল বিজনেস নামের আরেকটি সেবার সংজ্ঞা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইনভিত্তিক যেকোনো পণ্য বা সেবার ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরকে এই সেবার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

"