মাদকসেবী ৫০ হাজার : বছরে ব্যয় শতকোটি টাকা

রূপগঞ্জে ৩০০ মাদকের স্পট!

প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৮, ০০:০০

আল-আমিন মিন্টু, রূপগঞ্জ

মাদক বাণিজ্যের কালো থাবায় পর্যুদস্ত রূপগঞ্জের যুবসমাজ ও সেখানকার অর্থনীতি। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজারের মতো মাদকসেবী রয়েছে। বছরে মাদকসেবনে অপচয় হয় প্রায় ৯০ কোটি টাকা। দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য অনেকেই ঝুঁকে পড়ছে মাদক চোরাচালানে। এতে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ খুনোখুনির ঘটনা। রূপগঞ্জে মাদকের স্পট রয়েছে তিন শতাদিক। এর মধ্যে চনপাড়া পুনর্বাসনেই মাদক স্পট রয়েছে শতাদিক। আর মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ৪০০। খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০।

জানা গেছে, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইনজেকশনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যে সয়লাব হয়ে গেছে রূপগঞ্জ। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে এলাকায় নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে যুবকরা। গত এক বছরে মাদক-সংক্রান্ত ঘটনায় খুন হয়েছে ছয়জন। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ শতাধিক। মাদক ব্যবসায় রাঘবোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোয়ার বাইরে। উপজেলার ১২৮টি গ্রামের মধ্যে ১১২টি গ্রামেই মাদকব্যবসা চলছে।

মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে যারা : পুলিশ, এলাকাবাসী ও মাদকসেবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নয়ামাটি এলাকার মৃত হবুল্লার ছেলে কবির হোসেন, নগরপাড়া এলাকার মৃত তাফাজউদ্দিনের ছেলে মিতু মিয়া, রাতালদিয়া এলাকার রহমান আলীর স্ত্রী ছলে বেগম, সাওঘাট এলাকার মৃত উকিলউদ্দিন ভূঁইয়ার ছেলে মোশারফ হোসেন রঞ্জু, দরিকান্দি এলাকার পোশানির ছেলে মজিবুর রহমান, মাছিমপুর এলাকার আবদুল সালামের ছেলে জসিম, আবদুল মজিদের ছেলে পরদেশী সফিক, রূপগঞ্জ থানার পাশের নিলু ফকিরের ছেলে জুয়েল, রূপসী সøুইচগেট এলাকার চান্দু ফকিরের ছেলে জামাল-কামাল, মাছিমপুর এলাকার আকছারউদ্দিনের ছেলে তাওলাদ, চনপাড়া এলাকার বাদশা মিয়ার ছেলে ফেন্সি ফারুক, খোয়াজ বক্স হাওলাদারের ছেলে শাহ আলম, কালাদি এলাকার সোলায়মান মিয়ার ছেলে আমানউল্লাহ, সিদ্দিক মিয়ার ছেলে আলতাফ হোসেন, আতলাশপুর এলাকার ফারুক মোল্লার ছেলে নিশাত মোল্লা, হাটাবো টেকপাড়া এলাকার আবদুল হেকিমের ছেলে মিলন, তারাব হাটিপাড়া এলাকার ফিরোজ মিয়ার ছেলে আতিকুর রহমান, আক্কাস আলীর ছেলে সোহেল মিয়া, মধুখালী এলাকার ছাদেক মিয়ার ছেলে আবুল কসাই, গোয়ালপাড়া এলাকার নূর মোহাম্মদের ছেলে শফিকুল, ছনি এলাকার আমির হোসেনের ছেলে শামীম, গর্ন্ধবপুর এলাকার ফারুক মিয়ার স্ত্রী জাহানারা বেগম, আবদুল হকের ছেলে আবদুল সামাদ মিয়া, কাজেম মিয়ার ছেলে শরীফ মিয়া, ছফুল উদ্দিনের ছেলে ফারুক মিয়া, কামশাইর এলাকার হাবিবুল্লাহ মোল্লার ছেলে মিন্টু মোল্লা, তারাব হাটিপাড়া এলাকায় মাদক সম্রাট ফরিদ, দ?ক্ষিণ মাসা?বো এলাকায় মহ?সিন, বরপা এলাকায় রুহুল সিকদা?রের পুত্র সাইফু?দ্দিন, তোবারকের পুত্র নাহিদ ও তানভীর, লতিফের ছেলে অহিদ, সহিদ ও মিজানের পুত্র শাহিন সহ আরো অনেকে। এরা সবাই মাদকের ডিলার।

যেসব রুট দিয়ে আসছে মাদক : অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জে সড়ক ও নৌপথে অবাধে মাদকদ্রব্য আসে বলে জানায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা। মাদক প্রবেশের সবচেয়ে নিরাপদ রুট হচ্ছে বালু নদ। এ ছাড়া শীতলক্ষ্যা নদ দিয়েও মাদকদ্রব্য রূপগঞ্জে ঢুকে। এদিকে, এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক দিয়ে কুমিল্লা থেকে, আশুগঞ্জ-ব্রাক্ষ্মবাড়িয়া থেকেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে মাদক আসে। ভুলতা হচ্ছে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। বাস, নাইট কোচ, সংবাদপত্রবহনকারী মোটরসাইকেল কিংবা ট্রাকযোগেও মাদক আসে।

পাচারের নানা কৌশল : পুলিশ ও মাদক ব্যবসায়ীদের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র জানায়, ইয়াবা ও ফেনসিডিল বহন করা হয় লাউ, নারিকেল আর ম্যাচের বাক্সের ভেতরে করে। হেরোইন বহন করা হয় মিষ্টির প্যাকেটের ভেতরে করে। আর গাজা বহন করা হয় ছালার চটের ভেতরে করে। কাজে লাগানো হয় কোমলমতি শিশুদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের দিয়ে মাদক বহন করা হয়। মাদক ব্যবসার সুবিধার্থে রূপগঞ্জে সাত শতাধিক শিশু-কিশোর সেলসম্যান রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।

মাদককে ঘিরে ৬ খুন : থানা পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত সাত বছরে মাদকের কারণে পাঁচজন খুন হয়েছে। ২০০৮ সালের ২৭ আগস্ট মাদকের টাকা দিতে অস্বীকার করায় গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের মাহনা এলাকায় ব্যবসায়ী নূরুল ইসলাম মোল্লাকে তার নেশা আসক্ত ছেলে মিলন মোল্লা ও তার সহযোগীরা হত্যা করে। ১৯৯৫ সালে চনপাড়া বস্তিতে মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় তারা মিয়া নামে একজনকে খুন করে পিচ্চি মালেক। ২০০৮ সালের ২৫ অক্টোবর চানপাড়া বস্তিতে মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় আবদুর রহমান নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। ২০১১ সালে মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় মাছিমপুর এলাকায় নজরুল ইসলাম বাবু নামে এক যুবকেকে কুপিয়ে ও গুলি কর হত্যা করে মাদক কারবারিরা। ২০১২ সালে হাটাবো এলাকায় মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় সোহেল মিয়া নামে এক যুবককে হত্যা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মেহেদী হাসান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ছাড়া হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ শতাধিক। মাদক সেবন করে গত কয়েক বছরে মারা গেছে তিনজন।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট লায়ন মীর আবদুল আলীম বলেন, মাদকসেবী বেড়ে যাওয়ার জন্য আসলে সবাই দায়ী। শুধু প্রশাসনকে নয়Ñ অভিভাবক, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরাও দায় এড়াতে পারবে না। রূপগঞ্জের আলহাজ লায়ন মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া বলেন, অভিভাবকরা যদি তার সন্তানের দিকে সঠিকভাবে খেয়াল রাখে তাহলে সন্তান কুপথে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

রূপগঞ্জ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, মাদক নিয়ে নিয়মিত অভিযান চলে। রূপগঞ্জে অনেক এলাকা দুর্গম। এসব এলাকায় যেতে লাগে অনেক সময়। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতীক) বলেন, মাদক কারবারিরা কোনো দলের না। তারা দল এবং জাতির শত্রু। এদের কোনো ছাড় নেই। মাদক নির্মূলে প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে।

"