মাদক নিয়ন্ত্রণে নানা বাধা; বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বন্ধ করতে হবে উৎসমুখ

প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) নীতি নিয়েছে সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর দিন গত ৪ মে থেকে দেশজুড়ে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। সীমান্তের জেলাগুলোর মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছোট বড় ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তালিকায় শতাধিক প্রভাবশালীর নামসহ ৩ হাজার মাদক ব্যবসায়ীর নাম এসেছে। সে তালিকা ধরেই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অভিযান চলাকালে গত ৪ মে থেকে এ পর্যন্ত ৩৬ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে দুইজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী (গডফাদার)।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, রাষ্ট্রীয় পাঁচ সংস্থার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। বর্তমান সরকার মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি (শূন্য সহনশীলতা) অবলম্বন করছে। মাদক যে ভয়াবহ রূপ নিতে যাচ্ছে তাতে আমাদের মেধা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা ২০৪১ সালে যে বাংলাদেশের রূপ দেখতে চাচ্ছি, যদি মাদককে প্রতিহত না করা যায় তাহলে আমরা সে পর্যায়ে যেতে পারব না। সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। যেকোনো মূল্যে মাদককের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সরকার বদ্ধপরিকর।

পুলিশের আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী জানান, প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। এর আগে গত ৩ মে এলিটফোর্স র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গি দমনের মতো করে গুরুত্ব দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে তার জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন।

সরকারের চলমান মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে আলোচনা চলছে দেশজুড়ে। অভিযানের নানা দিক নিয়ে কথা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ইতিবাচক। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ অভিযান দীর্ঘস্থায়ী কোনো ফল বয়ে আনবে না। তারা এমনো মনে করেন, মাদকের উৎসমুখগুলো বন্ধ করতে হবে। কিছুতেই যেন দেশে মাদক প্রবেশ ও উৎপাদন হতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। মাদক সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

বিশেষ করে মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকসেবীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিষয় সংযুক্ত করে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮’ প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, ইয়াবা পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তবে বিদ্যমান পুরনো আইনে এটি মাদক হিসেবে তফসিলভুক্ত না থাকায় অন্য নামে ব্যবহৃত হয়। সেই নামেই বিদ্যমান আইনের ১৯ (১)-এর ৯ (ক) ও ৯ (খ) ধারায় বিচার হয়ে আসছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যায় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা।

বিশেষজ্ঞরা মাদক সমস্যা সমাধানে চারটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো হলো বেকার ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থান তৈরি, সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য কমানো, ছেলেমেয়েদের খেলাধুলাসহ সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং মাদকের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, এখন যেটা হচ্ছে তাতে মাদক নির্মূল হবে না; সাময়িকভাবে প্রশমিত হবে। নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে যারা মাদক গ্রহণ করে, যে কারণে করে, সেখানে হাত দিতে হবে। সাধারণত হতাশা থেকেই একজন মাদক নেয়। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই হতাশা আসে কর্মসংস্থানের অভাব ও সমাজে অসম প্রতিযোগিতা থেকে, নানা ধরনের বৈষম্য থেকে। এসবেরই সুযোগ নেয় মাদক ব্যবসায়ীরা। সুতরাং এগুলো দূর করতে হবে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে বাধা অনেক : স্বয়ং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে গঠিত মূল সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) সুগঠিত নয়। আমরা মাদকের মূলোৎপাটন করতে চাই। কিন্তু আমাদের লোকবল কম হওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, ১৭৬০ জনের জনবল কাঠামোর মধ্যে কাজ করে মাত্র ১১৯১ জন। এর মধ্যে ২৩৬ জন আউটসোর্সিং হিসেবে কাজ করে। তিনি আরো বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে অধিদফতরের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাহলো যদি কারো কাছে মাদক না পাই তাহলে তাকে গ্রেফতার করতে পারি না। গডফাদার হিসেবে আমি একজনকে চিনি বা জানি। কিন্তু তার কাছে কোনো মাদক না পেলে আমি বা আমরা ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছি না। তবে এ আইনটি পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।

এমনকি অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় লোকবল, তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও যথাসময়ে চার্জশিট দিতে না পারায় অধিকাংশ মাদক মামলার কার্যক্রম চলছে না। গত বছর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ১১ হাজার ৬১২ মামলা এবং ১২ হাজার ৬৫১ জন আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ২ হাজার ৫৪৪টির বিচার নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ১৬ জনের সাজা হয়েছে, খালাস পেয়েছে ১ হাজার ৫২৮ জন। শুধু ২০১১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত পেন্ডিং মামলার সংখ্যা ৪৮ হাজার ৬৮০টি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, মন্ত্রণালয়ের তালিকায় কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকার ৬০ গডফাদারের নাম আছে। এরাই দেশের সর্বত্র ইয়াবার মূল সরবরাহকারী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবা পাচার করছে। এ গডফাদারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের ভালো সম্পর্ক। ফলে এদের বিরুদ্ধে কখনোই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে এ কথা মানতে নারাজ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (গোয়েন্দা ও অপারেশন) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এ তালিকা ধরে গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে। সেখানে কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না।

আইন সংশোধন হচ্ছে : দেশে প্রচলিত ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী আসছে। এরই মধ্যে নতুন আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ওই খসড়ায় ইয়াবাকে ভয়ঙ্কর মাদক হিসেবে চিহ্নিত করে এটি মজুদ, বিক্রয়, পরিবহন, সংরক্ষণ তথা ব্যবসায় জড়িতদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কথিত ?‘অভিজাত নেশা’ সিসাকেও প্রথমবারের মতো মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনকে সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হচ্ছে। এই আইনে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন তিনি।

উৎসমুখ বন্ধ করার পরামর্শ : বিশেষজ্ঞরা মাদক নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে মাদকের উৎসমুখ বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য তারা দেশজুড়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তাদের মতে, মাদক ব্যবসায়ীদের যেমন নির্মূল করতে হবে; তেমনি যারা মাদক নিচ্ছে তাদের সে পথ থেকে বের করে আনতে হবে।

এ ব্যাপারে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে গল্পের বইপড়া, কবিতার বইপড়া, খেলাধুলা করা, বাগান করার নেশা জাগাতে হবে। সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকান্ডে যুক্ত করতে হবে। সামাজিকভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকে তার সন্তানের প্রতি যত্নবান হতে হবে। সরকারের একার পক্ষে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, মাদকের ভয়ানক ছোবলে দেশের তরুণ সমাজ যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, তা প্রতিকারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শুধু শাসন করে কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে মাদক থেকে বিরত রাখা যাবে না, তার প্রতি সহমর্মিতা, পারিবারিক ও সামাজিক মমতার মধ্য দিয়ে নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন দেখাতে হবে। মাদক প্রতিরোধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন তাদের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো সমন্বয় করতে হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ অভিযান দিয়ে মাদক সমস্যার সমাধান মিলবে না। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনগণকে সচেতন করে সমস্যা কমিয়ে আনতে হবে। এটা একটা পথ, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কারা ব্যবসা করছে, কারা এদের মদদ দিচ্ছে, এর মূল খুঁজে বের করতে হবে। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজতে হবে। উৎসগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে।

"