কৌতূহলী শিশুদের ছোড়া পাথরে ঘটছে প্রাণহানি

* আতঙ্কে রেলযাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা * বছরে ক্ষতি পৌনে ২ কোটি টাকা * দুইজনের মৃত্যু ও দুইজন মারাত্মক আহত

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

কৌতুকবশে চলন্ত ট্রেনে দুষ্টু ছেলেদের ছোড়া পাথরের ঢিলে প্রায়ই যাত্রীদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বাদ পড়েন না রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রেলের কোচ, ক্ষতি হচ্ছে বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা। অনাকাক্সিক্ষত এমন ঘটনা ঘটছে বছরে ১০০ থেকে ১৫০-এর মতো। এসব প্রাণঘাতী কৌতুক থামাতে জনসচেতনামূলক নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা।

কর্তৃপক্ষ বলছে, কৌতূহলবশত প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরা এই কাজটি করছে; অপরাধীর দৃষ্টিতে নয়। এছাড়া উন্নতমানের রেলের যাত্রী হতে না পারায় এক ধরনের ঈর্ষাও কাজ করে তাদের মধ্যে। অবচেতনভাবে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এমন ‘অপরাধের’ জন্য।

এসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও প্রত্যাশানুযায়ী ফলাফল মিলছে না। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ রেলপথ মন্ত্রণালয়। সমাধানে মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পুলিশের সহায়তা চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। নেওয়া হয়েছে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম। এত কিছুর পরও পাথর ছোড়া থামছে না। এ নিয়ে গতকাল রেলপথ সচিবের সভাপতিত্বে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে। সেখানে, অপরাধীদের শাস্তি বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং ও লিফলেট বিতরণসহ নানা মতামত এসেছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, যাত্রীবাহী ট্রেনে নির্দিষ্ট কিছু এলাকাতে কমবয়সী ছেলেমেয়েরা পাথর ছুড়ে মারছে। এটা যে অপরাধ, সেটাই তারা বুঝতে পারছে না। কারণ খেলার ছলে কিংবা কৌতূহলবশত তারা পাথর ছুড়ে বিনোদন খুঁজে নিচ্ছেন।

সচিব বলেন, শুধু আহত কিংবা প্রাণহানি ঘটছে তা নয়, কোচেরও ক্ষতি হচ্ছে। রেলের তথ্যানুযায়ী, বছরে পৌনে দুই কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতি হয়। গত পাঁচ বছরে জানালা ভেঙেছে দুই হাজারটি। এছাড়া এখন পর্যন্ত ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মারাত্মক আহত হয়েছেন।

সচিব আরো বলেন, ২০০৪ সালে সিলেটের আখাউড়া স্পটে সঞ্জীব কুমার বিশ্বাসের দুটি চোখ নষ্ট হয় যায়, ২০১২ সালে রেলচালক শাহাদাত হোসেন মারা যান, ২০১৩ সালে সীতাকুন্ডে প্রীতিদাস নামে একজন প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে খুলনার দৌলতপুরে শিকদার বায়েজিদ মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন। বায়েজিদ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বলে জানান সচিব।

রেল পুলিশের এডিশনাল এআইজি বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ-এশিয়ার অধিকাংশ দেশেই ঘটছে।

তিনি বলেন, ভারতে এ ঘটনা অনেক বেশি। ভারতের এক জরিপে বলা হয়েছে, মাইনর গোষ্ঠীর দ্বারা ৯৯ শতাংশ পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাজ্যেও রেলে পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটলেও তাদের সিসি ক্যামেরা থাকায় অপরাধীকে তাৎক্ষণিক ধরা যায়। কিন্তু আমাদের স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই; সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এরপরও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে মামলা ও জিডির ব্যবস্থা থাকা ভালো।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলন্ত রেলে পাথর ছোড়া স্পটের সংখ্যা ৬৫টি, যার মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৩৬টি এবং পশ্চিমে ২৯টি। এ এলাকাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়তলি এলাকা, সীতাকুন্ড-বাড়বকুন্ড এলাকা, ফাজিলপুর-কালিদহ, ফেঞ্চুগঞ্জ-মাইজগাঁও এবং নরসিংদী-জিনারদী ও ঘোড়াশাল। আর পশ্চিমাঞ্চলের চুয়াডাঙ্গার আউটার, আবদুলপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, শহীদ এস মনসুর আলী রেলওয়ে স্টেশন, বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশন মধ্যবর্তী এলাকা, মূলাডুলি রেলওয়ে স্টেশন, কিসমত-রুহিয়া, ভাঙ্গুরা, ভেলুরপাড়া, বামনডাঙ্গা, আক্কেলপুর, উল্লাপাড়া, বড়ালব্রিজ, সলপ, জামতৈল ও ফুলতলা রেলওয়ে স্টেশন এলাকা।

পাথর ছোড়ার ঘটনা ১৯৮৮ সাল থেকে শুরু হলেও ২০০৪ সাল থেকে ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন থেকেই নড়েচড়ে বসা শুরু হয় রেল কর্তৃপক্ষের। এই অপরাধে শাস্তির বিধান সম্পর্কে ১৮৯০ সালের প্রণীত আইনে বলা আছে, ১২ বছরের নিচে কোনো শিশু চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুড়লে এই অপরাধের জন্য বাবা-মা অপরাধী হবেন। সর্বোচ্চ শাস্তি ৫০ টাকা জরিমানা এবং অভিভাবকের মুচলেকা। কিন্তু গুরুতর আহত কিংবা নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি পর্যন্ত হয় না।

তাই রেল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ১২ জেলার ডিসিকে চিঠি পাঠান। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ইউওনো এবং ওসি, ১৬ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জন-নিরাপত্তা বিভাগের সচিব ও ধর্ম মন্ত্রণালয়কে এবং ২৬ এপ্রিল জনসাধারণকে সচেতন করার লক্ষ্যে মসজিদের ইমামদের ভূমিকা রাখার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে চিঠি দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। রেল কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে পাথর ছোড়ার ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব।

গতকাল রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চলন্ত ট্রেনে পাথর ও ঢিল নিক্ষেপ বন্ধে সচেতনতা বাড়াতে রেলওয়ে কর্মী, মিডিয়া কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পথর ছোড়া বন্ধে বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের মতামত তুলে ধরেন। সেখানে, জনসচেতনতা বাড়াতে শাস্তি বাড়ানো, জিডি করা, স্কুল পর্যায়ে শিক্ষকদের পাশাপাশি স্কুল কমিটির সভাপতিদের সম্পৃক্ত করে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা পৌঁছানো, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশের মাধ্যমে স্পটভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে সচেতন করা প্রভৃতি।

"