খুলনায় নৌকার জয়

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয় পেল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীর চেয়ে ৬৭ হাজার ৯৪৬ ভোট বেশি পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে তালুকদার আবদুল খালেক। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট। এর মধ্য দিয়ে বড় ব্যবধানেই জয় পেল ক্ষমতাসীনরা। মোট ২৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে তিনটির ভোট গ্রহণ স্থগিত করায় ২৮৬টি ভোট গ্রহণ হয়। এই জয়ের মধ্য দিয়ে খুলনা মেয়র পদ পুনরুদ্ধার করল আওয়ামী লীগ। দলের হয়ে দ্বিতীয় দফায় নগরপিতা হলেন তালুকদার

আবদুল খালেক। এর আগে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে খুলনা সিটি করপোরেশনে মেয়র হিসেবে জয় লাভ করেন তিনি। পরের দফায় ২০১৩ সালে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির কাছে হেরেছিলেন খালেক।

ভোট গণনা শেষে খুলনা উৎসবের নগরীতে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাসহ সাধারণ মানুষও রাস্তায় নেমে আসে। রং ছিটিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে আনন্দ উল্লাস করেন তারা। গভীর রাত পর্যন্ত এ উৎসব চলতে থাকে। এ সময় পরস্পরকে মিষ্টি খাওয়ান সমর্থকরা। বিশেষ করে খুলনা বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নির্বাচনী ফল সংগ্রহ ও ঘোষণা কেন্দ্রে ঢল নামে মানুষের।

জয়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় তালুকদার আবদুল খালেক বলেছেন, এই নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে সঙ্গে নিয়েই খুলনার উন্নয়নে কাজ করতে চান তিনি। ভোট দেওয়ায় জনগণের কাছে ঋণী উল্লেখ করে কাজের মাধ্যমে সেই ঋণ শোধ করার প্রতিশ্রুতিও দেন আগে এক দফায় খুলনার মেয়রের দায়িত্ব পালন করে আসা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি।

বহুল কাক্সিক্ষত এই জয় আনতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তালুকদার আবদুল খালেককে দলীয় প্রার্থী করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর জন্য তাকে বাগেরহাট-৩ সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করানো হয়। খুলনায় আওয়ামী লীগের এই জনপ্রিয় নেতা ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে বাগেরহাট-৩ থেকে পুনরায় নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

একেবারেই শেষ মুহূর্তে এসে এই নির্বাচনকে ঘিরে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয় রাজনীতিতে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রশ্নে নানা বিষয়ে পরস্পরেরর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। পরস্পরের বিরুদ্ধে হুমকি ধমকির অভিযোগও ওঠে। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির আশঙ্কা করে বিএনপির মেয়র প্রার্থী। এমনকি ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও কমিশন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা করা হয়। পক্ষান্তরে, বিএনপির বিরুদ্ধেও ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং এর আশঙ্কা করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। খুলনা ছাপিয়ে এই নির্বাচন গোটা দেশের মানুষের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ লড়াই লড়তে ভোটের মাঠে সর্বশক্তি নিয়ে শেষপর্যন্ত অটল থাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী ও প্রার্থীর লোকজন, দলীয় নেতাকর্মীরা। সতর্ক অবস্থায় ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রস্তুত ছিলেন ভোটররাও। শেষ পর্যন্ত কে হাসেন জয়ের হাসি- সেদিকেই ছিল সবার নজর।

শেষ পর্যন্ত এসব শঙ্কা ও উদ্বেগের কিছুই হয়নি। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সুন্দর পরিবেশে ও ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে ভোট। বিএনপির এক এজেন্টকে মারধর করা ছাড়া আইনশৃঙ্খলাজনিত বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে ভোট।

এই নির্বাচনে বড় ভোটের ব্যবধানেই জয় পেল আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে বেশ স্বস্তিতে আওয়ামী লীগ। বড় ধরনের কোনো অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে মুখ রক্ষা হলো সরকারের। দলীয় প্রার্থীর জয় ও নির্বাচনের পরিবেশ ভালো থাকায় সামনের নির্বাচনগুলোতেও ভালো করার স্বপ্ন দেখছেন দলীয় নেতারা। বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই ফলাফল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তারও প্রমাণ মিলল।

অন্যদিকে, পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মাঠের রাজনীতিতে আরো কোণঠাসা হলো বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ জাতীয় নির্বাচনের নানা দাবি দাওয়া নিয়ে মাঠের কর্মসূচিতে এখন খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষ করে এবারই প্রথম এই নির্বাচনে দুটি ওয়ার্ডের দুটি ভোটকেন্দ্রে ভোট হয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। সেখানে মেয়রপ্রার্থীদের নাম ও প্রতীক এবং সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতীকে বোতাম চেপে ইভিএমে ভোট দেন ভোটাররা। কেন্দ্র দুটি হচ্ছে সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পিটিআইয়ের জসিম উদ্দিন হোস্টেলের অস্থায়ী কেন্দ্র। এর মধ্যে প্রথম কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৯৯ জন, আর দ্বিতীয় কেন্দ্রে ১ হাজার ৮৭৯জন। ইভিএমের দুই কেন্দ্রেও জয় পান নৌকার প্রার্থী। আওয়ামী লীগের খালেক পেয়েছেন মোট ৭৭৭ ভোট। আর বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ৭১০ ভোট।

সকাল আটটা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলে। এ সময় বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে নানা অনিয়ম, অভিযোগ, ব্যালট পেপারে জোরপূর্বক সিল মারার ঘটনা ঘটেছে। আবার ভালো ভোটও হয়েছে অনেক কেন্দ্রে। প্রায় ৫ লাখ ভোটারের এ সিটির ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে তিনটি কেন্দ্রের ভোট অনিয়মের কারণে স্থগিত হয়েছে জানিয়েছেন এই নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী। এ ছাড়া আরো অন্তত সাতটি কেন্দ্রের-ভেতরে বাইরে গোলযোগ, অনিয়ম, এজেন্টদের বাধা ও নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

বিএনপি অভিযোগ করেছে, অর্ধেক ভোটকেন্দ্রেই নানা ধরনের অনিয়ম ঘটেছে, কেন্দ্রে ঢুকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর মার্কা নৌকায় সিল মেরে ব্যালট দিয়ে বাক্স ভরা হয়েছে, ধানের শীষের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে, সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি মারধরও করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ বলেছে, পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে ‘শান্তিপূর্ণ ও অবাধ’ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই বিএনপি ‘মিথ্যা অভিযোগ’ করছে।

ভোটের সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব হেলালুদ্দিন আহমেদ। ভোট গ্রহণ শেষে গতকাল বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন মনে করছে খুলনা সিটি করপোরেশনে চমৎকার নির্বাচন হয়েছে। দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠুভাবেই ভোট হয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বাকি কেন্দ্রে চমৎকার, সুন্দরভাবে, উৎসবের আমেজে ভোট হয়েছে।

চার ঘণ্টার ভোট শেষে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মোটামুটি ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে ধারণা দিয়েছিলেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল কবীর। তবে শেষ পর্যন্ত কত শতাংশ ভোট পড়ল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য এখনো নির্বাচন কমিশন জানায়নি।

নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট আওয়ামী লীগ। ভোটের শেষের দিকে এসে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে। এ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ দেওয়ার মতো তেমন কিছু নেই। আমরা খুলনার ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি এমনও বলেন, নারায়ণগঞ্জে যেমন নির্বাচন হয়েছিল, খুলনায় তেমনই হচ্ছে। তবে ভোটের শুরুতেই ৪০টি কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি জানান, ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে পুলিশের সহায়তায় ৪০টি কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে এজেন্টরা ঢুকতে পারছে না। অতীতের মতো সেই একই স্বরূপ, একই সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি।

এরপর ভোট শেষে বিকেলে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, ভোট-সন্ত্রাসের ঘটনায় খুলনা মহানগীর ভোটাররা ব্যথিত, বঞ্চিত ও অপমানিত। সারা দিন ধরে যা হয়েছে আমাদের কাছে মনে হয়েছে এটা একটা প্রহসনের মতোই।

অবশ্য রিজভীর এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, নিশ্চিত ভরাডুবি জেনে বিএনপি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। গতকাল দুুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নানক বলেন, এই নির্বাচন অত্যন্ত আনন্দ, উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব ভোটার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের কার্যক্রম চলছে, সেখানে শুরু থেকেই বিএনপি মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

খুলনার নির্বাচনে মেয়র পদে এবার পাঁচজন প্রার্থী। আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক নৌকা এবং বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুজ্জাম্মিল হক হাতপাখা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মিজানুর রহমান বাবু (কাস্তে) এবং জাতীয় পার্টির এস এম শফিকুর রহমান (লাঙল) প্রতীকে মেয়র পদে লড়েন। এ ছাড়া ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ১৪৮ জন এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৫ জন নারী কাউন্সিলর পদে লড়েছেন। মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। ভোট হয়েছে ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রে।

"