তিন ফর্মুলায় পাল্টে যেতে পারে চিত্র

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৮, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

কে কী বলল কিংবা কে কী চাইছে সেদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তাকিয়ে না থেকে ভোটারদের চাওয়া গুরুত্ব দিলে পাল্টে যেতে পারে খুলনা সিটি করপোরেশনসহ (কেসিসি) যেকোনো ভোটের চিত্র। এখন পর্যন্ত যে অজানা শংকা বিরাজ করছে এই সিটিতে তা-ও নিমেষেই উবে যেতে পারে। তাই সাতপাঁচ না ভেবে তিন ফর্মুলা অনুসরণ করতে পারে কমিশন। এগুলো হচ্ছে, নির্বাচনে পুলিশের দৌরাত্ম্যে লাগাম টানা, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খতিয়ে দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা; এর জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ক্ষমতা দেওয়া এবং ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটদানে উৎসাহিত করা এবং গণমাধ্যমকে কাজ করার সুযোগ রাখা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সাংবিধানিক সংস্থাটি ওই পথে হাঁটতে চায় কি না?

এত দিন ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইসি মুখে যা বলেন কার্যক্ষেত্রে তার কতটুকু অনুসরণ করেন। পেছনে তাকালে ভূরি ভূরি তথ্য মিলবে, মুখে যা বলেন কাজে তার উল্টোটাই করেন এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি। আবার কার্যক্ষেত্রে অধিক স্বচ্ছতা দেখিয়ে থাকে কমিশন; সেটা করে থাকে একচোখা নীতির কারণে। এখানেও তাদের কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকে। সর্বপরি তারা তাকিয়ে থাকেন ক্ষমতাধর কিংবা প্রভাবশালী পক্ষ কে কী বলছে কিংবা তাদের চাওয়াটা কী। প্রতিপক্ষ প্রভাবশালী হলেও এই সময়ে ক্ষমতা প্রয়োগে তারা সক্ষম কি নাÑ সেটিও সময়ে সময়ে পরিমাণ করে নেন তারা। তবে, তা কালেভদ্রে।

এত কথা বলার পেছনে একটাই কারণ, সমগ্র দেশের জনগণের দৃষ্টি এখন খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনের দিকে। আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টায় শুরু হবে ভোটযুদ্ধ। বিকাল ৪টায় রথযাত্রা থাকবে। টানা বিরতিতে চলবে এ কর্মযজ্ঞ। ইতোমধ্যে নির্বাচনী সামগ্রীসহ সবকিছু বিতরণ শেষ করেছে। ভোটের দু’দিন আগে থেকে র‌্যাব-বিজিবি মাঠে নেমেছে; থাকবে ভোটের পরদিন পর্যন্ত। অতীতের যেকোনো নির্বাচনের মতো পরিবেশ শান্তিপূর্ণ বিরাজ করছে দাবি করে বুলি আওড়িয়ে বেড়াচ্ছেন ইসির সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু পত্র-পত্রিকায় উল্টো খবর ছাপা হচ্ছে; এতেও তাদের বোধোদয় হচ্ছে বলে কথা-কাজে প্রতিফলন ঘটতে দেখা যাচ্ছে না।

এ নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে দুটি দল আবর্তে পুরো প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা এবং বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক। প্রধান দু’দলের প্রার্থী কথায় এবং অভিযোগে একে অন্যকে ঘায়েল করার চেষ্টা চালিয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মাধ্যমে ফল নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। কে ডি ঘোষ রোডের দলীয় কার্যালয়ে বিএনপির প্রার্থী এ সংবাদ সম্মেলন করেন। নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, একটি সুন্দর নির্বাচনের ফলকে নিজেদের অনুকূলে নিতে মরিয়া সরকারি দল। সেজন্য নানা কৌশল নিচ্ছে তারা। রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন ক্ষমতাসীন সমর্থিত প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক। তিনি বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ নাকচ করে বলেন, আওয়ামী লীগ ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিশ্বাস করে না। আওয়ামী লীগ জনতার রায়ে বিশ্বাস করে। ১৫ মে’র নির্বাচনে জনতার রায়ের প্রতিফলন ঘটবে। তিনি আরও বলেন, মঞ্জু ভোট বানচাল করার ষড়যন্ত্র করছে। তিনি অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের মাঠে নামিয়ে নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করতে চান। জনতা এ ধরনের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না। এ সময় তিনি ভোটকেন্দ্রে কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদানকারীকে গ্রেফতারের দাবি জানান। এর আগে রোববার মধ্যরাতে অর্থাৎ ১২টায় খুলনা সিটি নির্বাচনের সব ধরনের প্রচারণা শেষ হয়। তাই ভোট-পূর্ববর্তী ওই সংবাদ সম্মেলন করেন হেভিওয়েট দুই মেয়র প্রার্থী।

দুই প্রার্থী সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ এবং ভোটারদের নির্বিঘেœ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু প্রার্থী কিংবা ক্ষমতাসীনরা ভোটার কিংবা জনমনে আতংক তৈরি না করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ করে পুলিশি আতংক বিরাজ করছে পুরো সিটিজুড়ে। এ বিষয়ে ইসির কমিশন পর্যায় থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে একটাও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি। এর আগে ইউনিয়ন পরিষদসহ বেশকিছু ছোট ছোট স্থানীয় নির্বাচনে পুলিশের অনিয়মের কারণে সাবেক এক ইসি সচিব ৫১ জন পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। পরবর্তীতে তাকে সরকারবিরোধী আখ্যা দিয়ে অন্যত্রে বদলি করা হয়। অথচ কমিশন ওই কর্মকর্তার পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়নি। একইভাবে, গত গাজীপুর সিটি নির্বাচনে প্রভাবশালী একটি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রে ঢুকে প্রকাশ্যে ব্যালটে সিলমারা শুরু করেন। এ পরিস্থিতি দেখে ইসির ভাবমূর্তি রক্ষায় সংস্থাটির একজন নিজস্ব কর্মকর্তা পদক্ষেপ নিয়ে তাদের কেন্দ্র ছাড়ার করেন। তাৎক্ষণিক অভিযোগটি ইসি সচিব এবং কমিশনের কানে পৌঁছাতেই ওই নারী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পক্ষান্তরে কমিশন অভিযোগকারীদের পক্ষে অবস্থান নেন।

একইভাবে, নারায়নগঞ্জ সিটি নির্বাচনে প্রভাবশালী একটি দলের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রতি সমর্থন থাকায় ইসি তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে শেষ করেন। আবার কুমিল্লায় ১০৩ কেন্দ্রের প্রত্যেকটিতে ছোটখাটো কারচুপির ঘটনা ঘটে, কিন্তু রিটার্নিং অফিসার অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে সাময়িক ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখায় ফল উল্টো যায়। খুলনা সিটির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের পথে কোনো পক্ষ কিংবা পুলিশ অন্তরায় সৃষ্টি করলে সাময়িক ভোটগ্রহণের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিলে কুমিল্লার মতো এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এর ব্যতিক্রম ঘটলে আইনশৃঙ্খলা দিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে রাখলেও নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো অসম্ভব।

একইভাবে, ভোটারদের বাধা দিলে সেটা গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক খবরটি প্রকাশ হলে কমিশন থেকে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া এবং শাস্তির কথা শোনানো। গণমাধ্যমকে নির্বিঘেœ কাজ করার সুযোগ দিলেও ভোট অনেকটা সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব। এছাড়া কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের কাছ থেকে ভোটের প্রকৃত চিত্র নিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে ইসির প্রতি মানুষের যেমন আস্থা বাড়বে। একইসঙ্গে অপরাধীরা নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব করার সাহস দেখাবে না। এর মাধ্যমে নির্বাচনে সুস্থ সংস্কৃতির ধারা রচিত হতে পারে।

"