বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

হাতের মুঠোয় মহাকাশ

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

বাংলাদেশের মহাকাশ জয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। একেবারেই দ্বারপ্রান্তে। বৃহস্পতিবার শেষ মুহূর্তে গিয়ে উড়তে পারেনি দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার মধ্যরাতের পর আবারও উড়াল দেওয়ার কথা দেশের বহুল কাক্সিক্ষত স্বপ্নের উপগ্রহটির। এবার ঠিক ঠিক উড়াল দিতে পারলে ও সব প্রক্রিয়া শেষে মহাকাশে লাল-সবুজ পতাকাখচিত উপগ্রহটি স্থাপন করা গেলে স্যাটেলাইট ক্ষমতাধর ৫৭তম দেশের তালিকায় যুক্ত হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্যাটেলাইটও সর্বক্ষণ প্রদক্ষিণ করবে পৃথিবীর চারপাশ। হাতের মুঠোয় আসবে মহাকাশ। মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে বাংলাদেশের। স্যাটেলাইট যুগের নব সূচনায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নাম।

বিশেষ করে এই স্বপ্নযাত্রার নব সূচনার জন্য বাংলাদেশসহ স্যাটেলাইট বিশ্ব স্মরণ করবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের মনে বীজ রোপণ করেছিল মহাকাশ জয়ের প্রথম স্বপ্ন। কিন্তু ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে থেমে যায় সে স্বপ্নযাত্রা। ১৯৯৬ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসে এ-সংক্রান্ত উদ্যোগ নেয়। পরে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে সে উদ্যোগ বাতিল করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এমনকি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এ প্রকল্পটি চালু করেনি। অবশেষে বর্তমান সরকার পরপর দুই দফার ক্ষমতায় থেকে দীর্ঘ ৪৩ বছর পর মহাকাশে স্থাপন করতে যাচ্ছে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। বাবার হাতে সূচিত স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এই স্বপ্ন জয়ের মধ্য দিয়ে কেবল বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলই নয়; বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের রয়েছে নানা সম্ভাবনা; বাণিজ্যিক দিকও। সবকিছু ঠিক থাকলে এই স্যাটেলাইট থেকে নানামুখী সুফল পাবে দেশের মানুষ। একদিকে যেমন স্যাটেলাইটের সক্ষমতা বিক্রি করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে ও এ খাতের ব্যয় সাশ্রয় করা যাবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে; তেমনি দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই স্যাটেলাইট। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো সম্ভব।

তবে এই সম্ভাবনার জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পরও বাংলাদেশকে অন্তত দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছে বিটিআরসি। সংস্থাটির মতে, দুটি পর্যায়ে উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম পর্যায়টি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে ১০ দিন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে লাগবে ২০ দিনের মতো। মহাকাশে পৌঁছার পর বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে লাগবে প্রায় এক মাস। এরপর কারিগরি বিভিন্ন বিষয় শেষ করে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও এক মাস সময় লাগবে বলে ধারণা বিটিআরসির। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় নির্মিত হয়েছে গ্রাউন্ড স্টেশন। স্যাটেলাইট মহাকাশে উন্মুক্ত হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনে চলে যাবে। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর সেটির নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর হবে।

সফল উৎক্ষেপণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর উৎক্ষেপণ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদসহ প্রায় ৪২ সদস্যের প্রতিনিধি দল উৎক্ষেপণ উপলক্ষে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় স্পেস এক্সের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে উপস্থিত রয়েছেন। এ ছাড়া সাংবাদিকসহ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অসংখ্য বাংলাদেশি এবং দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও প্রযুক্তিবিদরা সেখানে রয়েছেন।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, স্যাটেলাইটের এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। বেসরকারি খাতকেও দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। উৎক্ষেপণের পর মুহূর্ত থেকে এ স্যাটেলাইটের মেয়াদ থাকবে ১৫ বছর। সে জন্য সময়ক্ষেপণ না করে স্যাটেলাইটের উদ্দেশ্য পূরণে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যেতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সব প্রস্তুতিই ছিল। বাংলাদেশ সময় ভোররাত ৩টা ৪৭ মিনিটে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহটির যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশ পানে যাত্রা শুরুর কথা ছিল। সব প্রস্তুতি সেরে উৎক্ষেপণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল; কিন্তু মিনিটখানেক আগে সমস্যা দেখা দেওয়ায় স্যাটেলাইটটি আর উড়েনি লঞ্চ প্যাড থেকে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ স্থগিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। উৎক্ষেপণের মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষা করা খুবই সাধারণ বিষয় এবং এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই বলে তিনি জানিয়েছেন ওই পোস্টে। পোস্টে সজীব ওয়াজেদ জয় লিখেছেন, ‘উৎক্ষেপণের শেষ মুহূর্তগুলো কম্পিউটার দ্বারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। হিসেবে যদি একটুও এদিক সেদিক পাওয়া যায়, তাহলে কম্পিউটার উৎক্ষেপণ থেকে বিরত থাকে। আজ যেমন নির্ধারিত সময়ের ঠিক ৪২ সেকেন্ড আগে নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটার উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। স্পেসএক্স সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগামীকাল একই সময়ে আবারও আমাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বহনকারী রকেটটি উৎক্ষেপণের চেষ্টা চালাবে।’ রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়া হয় না, তাই এ রকম হওয়াটা ‘খুবই স্বাভাবিক’ বলেও মন্তব্য করেন জয়।

স্পেসএক্স এক টুইট বার্তায় উৎক্ষেপণ স্থগিতের কারণ জানিয়ে বলেছে, শেষ মিনিটে কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখা হয়েছে। রকেট ও স্যাটেলাইট ভালো অবস্থায় আছে। গতকাল শুক্রবার রাতে আবারও নির্ধারিত সময়ে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি ফের শুরু হবে বলেও জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে কেনেডি স্পেস সেন্টারে থাকা বিটিআরসি প্রধান শাহজাহান মাহমুদ বলেন, বহু ঘটনা আছে, যেখানে কাউন্ট ডাউনের একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়েও উৎক্ষেপণ স্থগিত করতে হয়েছে। এমনকি এর আগে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে পরপর ছয়বার স্থগিত করার ঘটনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন কেনেডি স্পেস সেন্টারে থাকা বাংলাদেশের দ্য ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক শাহেদ সিদ্দিকী।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান তালিস এলিনিয়া স্পেসের তৈরি বাংলাদেশের জাতির জনকের নামাঙ্কিত এই স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের মাধ্যমে। কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড ৩৯-এ থেকে এটি উৎক্ষেপণ হচ্ছে, এই প্যাড থেকেই মানুষকে নিয়ে চাঁদে রওনা হয়েছিল চন্দ্রযান এ্যাপোলো-১১।

বিটিআরসির তথ্যমতে, এ স্যাটেলাইট নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মাত্র তিন থেকে ছয় বছরেই এই স্যাটেলাইট পাঠানোর সব খরচ উঠে আসবে। বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ যে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে, এ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ফলে সেই অর্থ সাশ্রয় হবে। এই স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের কাছে স্যাটেলাইট সেবা দিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ইন্দোনেশিয়ার একদম ওপরে। ফলে ইন্দোনেশিয়া থেকে সামনের দিকে যত দেশ আছে যেমন মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর সবই এই স্যাটেলাইটের অধীনে থাকবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে চাকরির নতুন ক্ষেত্র ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলেও মনে করেন প্রযুক্তিবিদরা। তাদের মতে, ডাইরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ) পদ্ধতিতে স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যাল গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলেও সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচার করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের বিদ্যমান টেরেস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যোগাযোগব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করা যাবে। বিশেষ করে সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই ৪ এবং সি-মি-উই ৫ যদি কোনো কারণে কাজ না করে তখন বিকল্প যোগাযোগে এই স্যাটেলাইট কাজে আসবে। এমনকি কৃষি, বন, মৎস্য, ভূতত্ত্ব, মানচিত্র তৈরি, পানি সম্পদ, ভূমি ব্যবহার, আবহাওয়া, পরিবেশ, ভূগোল, সমুদ্র, বিজ্ঞান, শিক্ষা এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রে মহাকাশ ও দূর অনুধাবন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য গবেষণায়ও তথ্য-উপাত্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই স্যাটেলাইটের সহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

"