বিশ্লেষণ

দুই কোরিয়ার যুদ্ধ শেষের বার্তা

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ama ami

সাড়ে ছ’দশকেরও বেশি সময়ের ব্যবধান। দুই দ্বীপরাষ্ট্রকে ভাগ করছে যে সামরিক রেখা, সেটি পেরিয়ে এই প্রথম উত্তর কোরিয়ার কোনো রাষ্ট্রনেতার পা পড়ল দক্ষিণ কোরিয়ায়। গত শুক্রবার সকালে দু’দেশের নেতা হাতে হাত মেলালেন। কথা বললেন। আর সেনামুক্ত অঞ্চলে (ডিমিলিটারাইজড জোন) সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী রইল উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ সারা পৃথিবী। ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর দু’দেশের তিক্ততার শুরু। দীর্ঘ ৬৫ বছরের যন্ত্রণার এবার শেষ। সে যুদ্ধে ইতি টানার কথা ঘোষণা করে শান্তির শপথ নিলেন উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন। সামরিক রেখা পেরিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় যখন পা দিলেন কিম, তখন তার চারপাশ থেকে সরে গেছেন সরকারি সব স্তরের কর্মী। তিনি একাই এগিয়ে যান এবং বলেন, এটা শান্তির ‘প্রথম ধাপ।’ তার পর হাসিমুখে দু’নেতার করমর্দন, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ছবি। সব ছকে বাঁধা। হঠাৎই প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের দিকে হাত বাড়ালেন কিম, যেন বললেন, ‘চলুন ও-পারটাও একটু ঘুরে আসি!’ ভিডিওবন্দি হলো সে দৃশ্য। মুহূর্তের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ঘুরে এলেন কিমের দেশ। আবার ফিরেও এলেন। সোলের সংবাদমাধ্যমের দাবি, রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠক পরিকল্পনামাফিক এগোয়। কিন্তু কিম যেভাবে ডেকে নিয়ে গেলেন মুনকে, তা মোটেই ‘প্রটোকলে’ লেখা ছিল না।

পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের মধ্যে আন্তঃকোরীয় সম্মেলন ছিল একটি ঐতিহাসিক বৈঠক, যা নতুন যুগ শুরুর পথ সুগম করেছে। যুদ্ধ শেষের ঘোষণার পরেই গতকাল শনিবার জানা যায়, কোরীয় উপদ্বীপে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে বলে সম্মত হয়েছেন দুই নেতা। বস্তুত আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের আগ্রহ ছিল এই বিষয়ে কিম কী বলেন, তা জানতে। কিম সরাসরি এ বিষয়ে মুখই খোলেননি। শুধু সইসাবুদেই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষান্ত দিয়েছেন তিনি। আর তাই এ ব্যাপারে গোটা বিশ্বের উদ্বেগ এতটুকু কমেনি। কূটনীতিকদের ধারণা, কিম তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে যতই সক্রিয় হোন, তার একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার স্মৃতি এত দ্রুত মুছে যাবে না মানুষের মন থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ভালো জিনিস ঘটছে। সময়ই সব বলবে।’ ট্রাম্পের বক্তব্যের শেষটুকু দেখে অনেকেই মনে করছেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যে সংশয় জিইয়ে রেখেছেন কিম, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইঙ্গিত সে দিকেই। দু’দেশকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন এবং রাশিয়া।

পাশাপাশি বসে স্বাক্ষরের আগে দুই নেতা একান্তে আধ ঘণ্টা আলোচনা করেন, সেনামুক্ত অঞ্চলে পানমুনজম গ্রামের ‘পিস হাউস’-এ বসে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, এ বছরের শেষে পিয়ংইয়ং যাবেন প্রেসিডেন্ট মুনও। যুদ্ধ শেষের ঘোষণা শুধু নয়, দু’দেশ একটি ‘মৈত্রী দফতর’ তৈরি করবে, যেখানে যুদ্ধের জেরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষজন ফিরে পাবেন আপনজনকে। জুনের মাঝামাঝি ফের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের কথাও হয়েছে। কথা হবে দু’দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরও।

স্বাক্ষর শেষে দুই নেতা জড়িয়ে ধরেন একে অপরকে। কিম বলেন, ‘এই মুহূর্তটা কবে আসবে, তার জন্য আমরা বহু দিন অপেক্ষা করেছিলাম, আমরা সবাই। যে পথ ধরে আজ আমি এগিয়েছি, আশা রাখি উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যেক নাগরিক সে পথে এগোবেন। যুদ্ধের ভয় ভুলে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি-সমৃদ্ধি নিয়ে আমরা বাঁচব।’ মুনও বলেন, ‘আর যুদ্ধ হবে না। শান্তির নতুন যুগ শুরু হলো।’ প্রথম-পর্ব শেষের পরে দুই নেতা নিজ নিজ দেশে মধ্যাহ্নভোজ সারেন। বিকেলে ফের দেখা। দু’দেশের মাটি আর জল মিশিয়ে পাইন গাছ রোপণ করেন দু’জন। পরে একসঙ্গে নৈশভোজ। আরো কিছু স্বাক্ষর এবং যৌথ বিবৃতিও দেন তারা।

নতুন যুগের সূচনা করেছে উ. কোরিয়া : উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের মধ্যে আন্তঃকোরীয় সম্মেলন ছিল একটি ঐতিহাসিক বৈঠক, যা নতুন যুগ শুরুর পথ সুগম করেছে। শনিবার পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ কথা জানিয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা কেসিএনএ জানায়, এটি একটি ঐতিহাসিক বৈঠক ছিলÑযা জাতীয় ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা করেছে।

সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে দুই নেতা কোরীয় উপদ্বীপে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন করার মাধ্যমে অভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কথা নিশ্চিত করেন।

বছরের পর বছর ধরে পিয়ংইয়ং জোর দিয়ে বলে আসছে যে, তারা কখনো তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করবে না। এ ব্যাপারে পিয়ংইয়ংয়ের যুক্তি হচ্ছে, সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের হাত থেকে নিজের দেশকে রক্ষায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সিউল জানিয়েছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া এ ব্যাপারে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। যদিও কিম শুক্রবারের বহুল প্রত্যাশিত সম্মেলনের ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলেননি। কোরীয় উপদ্বীপকে বিভক্ত করা সামরিক সীমান্ত লাইন অতিক্রম করায় কিম হলেন উত্তর কোরিয়ার প্রথম নেতা যিনি কোরীয় যুদ্ধের অবসানের পর দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে পা রাখলেন। ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে।

"