সংবিধানে সংসদ ভেঙে নির্বাচনের বিধান নেই

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

সংসদ বহাল রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে; নাকি ভেঙে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনÑ গত কয়েকদিন ধরে এমন আলোচনা নতুন করে ঘুরপাক খাচ্ছে নির্বাচনী রাজনীতিতে। বিশেষ করে ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নতুন করে সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলছে। দলের নেতারা এই পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না বলেও বক্তব্য দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, বিএনপির এমন দাবি নাকচ করে দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচন হবে। সেখানে সংসদ ভেঙে বা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করে নির্বাচনের কোনো সুযোগ সংবিধানে নেই। এমনকি বিএনপির দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ব্যবস্থাও সংবিধানে নেই। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এ কথাও বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে ভোট হয় বাংলাদেশেও সেভাবেই হবে। সরকারের লক্ষ্য সব দলকে নিয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

আওয়ামী লীগ নেতারা এমনও বলছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে এবং বিএনপি সে নির্বাচনে অংশ নেবে। দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এমন নির্বাচনের জন্যই প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া আছে। এ জন্য স্বয়ং দলের সভাপতি শেখ হাসিনা আগেভাগেই নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। ভোট প্রার্থনা করছেন। বিএনপি নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে সেক্ষেত্রে প্রয়োজন দেখা দিলে আলোচনা হতে পারে। তবে সেটা নির্ভর করবে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির ওপর। সেক্ষেত্র বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে, অসাংবিধানিক পথে গেলে বা নির্বাচন বয়কট করলে, সময় ও সংবিধান অনুযায়ী, অন্যান্য দলকে নিয়েই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করবে সরকার।

এর আগে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপির দাবিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেছেন তিনি। গত ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারের সময়ে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব পালন করবে। এ সময় সরকারের পরিসর ছোট করা হবে। সরকার নির্বাচনের সময় শুধু রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না। তিনি এমনও বলেছেন, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন হচ্ছে সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী, সহায়ক সরকার বলে কোনো সরকার গঠন করার বিধান নেই।

আবার বিএনপি সংসদ ভেঙে নির্বাচনের দাবি তুললেও দলের সামনে বেশকিছু সংকট সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে পারা না পারা ও তাকে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসছে। এই সংকট মোকাবিলা করে নির্বাচনী দাবি আদায় করতে ঠিক কতটা পেরে উঠবে; তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এসব সংকট কাটিয়ে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্নে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দলটি। আবার বিএনপিকে বাইরে রেখে সরকারকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে না দেওয়ার ব্যাপারেও তৎপর দল।

ফলে একদিকে যেমন সংসদ বহাল রেখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে; আবার বিএনপিকে ব্যতিরেকে নির্বাচনের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচনের বদনামও নিতে চায় না ক্ষমতানসীনরা। আবার নির্বাচন কমিশনও বলছে, সংসদ ভাঙা বা নির্বাচনকালীন সরকারের গঠন ইসির বিষয় নয়। নির্বাচন হবে সংবিধান অনুসারে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য হবে এবং বিএনপিও সে নির্বাচনে অংশ নেবে। বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো সহায়ক সরকার নয়, এ সরকারই আগামী নির্বাচনকালীন তিন মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে কাজ করবে। তবে তারা কোথাও নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে না, নির্বাচন কমিশনই স্বাধীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।

এর বিপরীতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচন হবে সংসদ ভেঙে দিয়ে। অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য তিনি সবাইকে প্রস্তুত থাকারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন একই সুতায় গাঁথা। এদেশের গণতন্ত্রের মুক্তির অর্থ বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি। খালেদা জিয়া মুক্ত হলে গণতন্ত্রও মুক্তি পাবে। আগামী নির্বাচন, মানুষের ভোটের অধিকার বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে নিশ্চিত হবে।

সেক্ষেত্রে সংবিধান কি বলে- জানতে চাইলে এ ব্যাপারে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমান সংবিধানে সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। সংসদ বহাল থাকবে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপিকে রাখার সুযোগ নেই। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে তা সংবিধানে কিছুই বলা নেই। সরকার যদি চায় সংসদে যারা আছেন, তাদের দিয়ে অথবা বাইরে থেকে টেকনোক্রেট হিসেবে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে পারেন। তবে এটা কিভাবে হবে, তা ওই সময়ের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেবে।

এর আগে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ছোট সরকার গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা। ২০১৩ সালের নভেম্বরে গঠিত নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় ২১ জন মন্ত্রী ও সাতজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এবার কেমন হবে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। তাছাড়া বিএনপি এখন সংসদে নেই। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তারা অংশ নেয়নি। শেখ হাসিনা বলে আসছেন, অংশ নিলে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেওয়া হত। এমনকি ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের জন্য খালেদা জিয়াকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি।

‘বিএনপির দাবি অসাংবিধানিক’- ব্যাখ্যা দিয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করতে পারেন। যদি তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা হারান অথবা রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের জন্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন কাউকে না পান, কেবলমাত্র ওই কারণেই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন কাউকে পাওয়া গেলে মেয়াদ অবসানের একদিন আগেও রাষ্ট্রপতির সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।

সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের আসন শূন্য ঘোষণা না করেই ৩০০ আসনের নির্বাচন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে।’ এই বিধানের কারণে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশনকে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করতে হবে।

সংবিধানের ৫৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে।’ ৫৬ অনুচ্ছেদের (২) উপ-অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে তাহার সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন।’ একই অনুচ্ছেদের ২ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান- অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।’ নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী এই সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগে সংবিধানে কোনো বিধি নিষেধ নেই। এমনকি রাষ্ট্রপতির কর্ম সম্পর্কে সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে যে নির্দেশনা রয়েছে নির্বাচনকালীনেও একই ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতিকে সকল কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী, করতে হবে। ফলে বর্তমান সময়ে এবং নির্বাচনকালে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য সংবিধানে নির্দিষ্ট নেই।

তবে সংসদ ভেঙে আগাম নির্বাচনের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে জানান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। তিনি বলেন, সংসদ ভাঙার প্রবিধান সংবিধানে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন ভাঙবে সংসদ? কি প্রেক্ষাপটে সংসদ ভেঙে দিতে হবে? সেটা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। দেশে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যেটা প্রধানমন্ত্রী করেছেন এর আগেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা। এটা কিন্তু সংবিধানে নেই। তারপরও তিনি করেছেন। এবারও তিনি কিন্তু একটি প্রস্তাব করেছেন। সেই সরকার কোনো পলিসি মেকিং করবে না।

"