প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের নতুন কৌশল

আইডি নয় দিতে চায় ভেরিফিকেশন কার্ড!

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের কর্মকান্ড রীতিমতো তামাশায় রূপ নিয়েছে। শুরু থেকেই প্রত্যাবাসনের নামে দেশটি এমন সব কাজ করছে তাতে কেবল রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চরম অনীহায় প্রকাশ পাচ্ছে না; রীতিমতো ঔদ্ধত্যও দেখাচ্ছে দেশটি। এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত দ্বিপক্ষীয় কোনো চুক্তির একটি অংশও মানেনি মিয়ানমার সরকার। বরং চুক্তির নানাদিক নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি করছে। আমলে নিচ্ছে না বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশের নানা বিধিনিষেধ আরোপ এবং আন্তর্জাতিক চাপ। মুখে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বললেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ভিটেমাটি বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে। নাগরিকত্বের পরিবর্তে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড দেওয়ার নামে আরো নিরাপত্তাহীন করে তোলার কৌশল নিয়েছে দেশটি। এমনকি সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো হচ্ছে নানা ধরনের নির্যাতন। ফলে এখনো রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।

সর্বশেষ গত শনিবার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার অনিচ্ছার আরেকটি প্রকাশ ঘটিয়েছে। গভীর রাতে ‘নোম্যানসল্যান্ড’ থেকে একটি রোহিঙ্গা পরিবারকে ফেরত নেওয়ার মধ্য দিয়ে মিয়ানমার প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। অথচ ওই পরিবারটি মিয়ানমারের ভেতর এলাকাতেই ছিল। টাকার বিনিময়ে ওই পরিবারকে দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরুর প্রচারণার কৌশল হিসেবেই এমনটি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই পরিবারের বাড়ি মিয়ানমারের তুমব্রু এলাকায় এবং পরিবারের কর্তা ওই এলাকার চেয়ারম্যান। ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড (বিজিপি)। সেখানে গিয়ে পরিবারের প্রধানসহ অন্যান্য সদস্যরা বিজিপির কাছ থেকে পরিচয় শনাক্তকরণ কার্ড বা ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) সংগ্রহ করেছেন।

অবশ্য এই ঘটনাকে বাংলাদেশ হাস্যকর বলে অভিহিত করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলছে, এটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কোনো অংশ নয়। বিষয়টির সমালোচনা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও। তিনি পুরো বিষয়টি হাস্যকর হিসেবে অভিহিত করে বলেন, নোম্যান্সল্যান্ডের ৬ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র একটি পরিবারকে ফিরিয়ে নেওয়া হাস্যকর। আমরা মিয়ানমারকে বারবার বলেছিÑ যারা শূন্য রেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি তাদের চিহ্নিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। এসব রোহিঙ্গা বলছে, তাদের বাড়িঘর পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই আছে। সেখানে এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাক মিয়ানমার। তাদের জন্য ব্যবস্থা করুক। এসব রোহিঙ্গা তো মিয়ানমারের এলাকাতেই বসে রয়েছে। কিন্তু সময় সময়ই মিটিংয়ের পর মিটিং হচ্ছে। তবে আমরা আশা করছিÑ মিয়ানমার সব রোহিঙ্গাকে নিয়ে যাবে। শুধু ৬ হাজার নয়, সবাইকে নিয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, তাদের লোক তারা যেকোনো সময় ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সীমান্তের জিরো লাইনে আশ্রয় নেওয়া একটি পরিবার মিয়ানমারে ফিরে গেলে এটাকে প্রত্যাবাসন শুরু হয়েছে বলা যাবে না। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেই কেবল প্রত্যাবাসন শুরু হয়েছে বলা যাবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে মিয়ানমারের কাছ থেকে অনুকূল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, বাংলাদেশ প্রথম দফায় ৮ হাজার ৩২ জনের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছিল। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ৭০০ রোহিঙ্গার বিষয়ে মিয়ানমার অনুমোদন দিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আরো একটি তালিকা প্রস্তুত হলেও এখনো তা হস্তান্তর করা হয়নি। মিয়ানমার সরকার আন্তরিক হলে যেকোনো মুহূর্তে প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে।

বেশ কিছু দিন ধরেই জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এইচআরডব্লিউসহ বেশ কিছু সাহায্য সংস্থা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। রোহিঙ্গারা যেন স্বেচ্ছায় ও সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারে আগে সেই পরিবেশ নিশ্চিতে প্রায় সব পক্ষই মিয়ানমারকে আহ্বান জানাচ্ছে। প্রত্যাবাসন সুষ্ঠু করতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চাপ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবকে ফোন করেন। এমনকি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের এই তালিকাভুক্ত হলো। নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেয়ার উদ্দেশ্যে মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেসের প্রস্তুত করা এক প্রতিবেদনে কালো তালিকাভুক্তির কথা জানা গেছে। ওই প্রতিবেদনে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস বলেছেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মেডিকেল স্টাফ ও অন্যরা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম যে নৃশংস নির্যাতনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে তার প্রমাণ পেয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে স্থানীয় কথিত উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালানোর সময় এই নৃশংসতা চালিয়েছে। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশছাড়া হতে বাধ্য করতে এবং দেশে ফেরত যাওয়া বন্ধ করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক হুমকি ও যৌন সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। তারা সমন্বিতভাবে এ সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। অমানবিকভাবে নির্যাতন করেছে। গত সোমবার প্রতিবেদনটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে উত্থাপন করা হয়।

এর মধ্যেই হঠাৎ করে মাত্র একটি রোহিঙ্গা পরিবারকে ফেরত নেওয়াকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাব বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা এই ঘটনাকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদেও ফেরত না নিতে নতুন কূটকৌশল বলে মনে করছেন। এই কৌশল হিসেবে মিয়ানমার ন্যাশনাল আইডির বদলে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড দিতে চায়। এর ফলে রোহিঙ্গারা সেখানে আরো ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক ও রোহিঙ্গা গবেষক অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, এখন মিয়ানমার নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা নাগরিকত্ব দিতে চাচ্ছে না। এর পরিবর্তে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড দিতে চাচ্ছে। এটি হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিলেও তারা ঘরের থেকে বের পর্যন্ত হতে পারবে না। অথচ নাগরিকত্ব কার্ড পেলে সব ধরনের সুবিধা পাবে। মিয়ানমারের অন্যান্য নাগরিকের মতোই পূর্ণ অধিকার নিয়ে থাকতে পারবে।

এই গবেষক বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের দাবি তুলতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। আন্তর্জাতিক চার অপরাধের মধ্যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যা পড়ে। সুতরাং যেকোনো দেশ বা নাগরিক রোমের আদালতে এই বিচার চাইতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখবে।

মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বললেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা অব্যাহত রয়েছে। এখনো ঢোকার অপেক্ষায় বান্দরবান পার্বত্য জেলাধীন কোনারপাড়া জিরো পয়েন্ট নোম্যানসল্যান্ডে প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর আগে জিরোলাইন থেকে রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজ দেশে সরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তুমব্রু সীমান্তে বৈঠক করে চাপ সৃষ্টি করা হয়। জবাবে মিয়ানমার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার কথা বললেও এখনো কিছুই করেনি। বরং সেখানে তাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সম্প্রতি জেনেভায় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সরকার যাতে তাদের নাগরিকদের দ্রুত ফেরত নেয় সেজন্য আমাদের সরকার আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। যে পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে তখন তাদের আশ্রয় না দিলে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত মানবিকভাবে বিষয়টি নিয়েছেন ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। এজন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছেন।

এদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তি করলেও এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ বসবাসের ব্যবস্থা করেনি। উল্টো সেখানকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এমনকি মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকূল নয় বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘ। মিয়ানমারে ছয় দিনের সফর শেষে গত ৮ এপ্রিল এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ও জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম বিষয়ক উপসমন্বয়ক উরসুলা মুয়েলার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পরও ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা ছয় বছর ধরে শিবিরে বন্দি রয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সব সম্প্রদায়ের প্রয়োজন ও অধিকারের ভিত্তিতে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।

 

"