নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই মন্ত্রী-এমপিদের

আচরণবিধি সংশোধনের দাবি নাকচ

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ কারণে নির্বাচনের প্রচার কাছে নামতে পারছেন না মন্ত্রী ও এমপিরা। আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠেয় খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনে এমপিদের প্রচার কাছে অংশ নেওয়ার সুযোগ রেখে আচরণবিধির পরিবর্তন চেয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। কিন্তু দলটির দাবি নাকচ করে বিধি সংশোধন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। ইসির মতে, বিধি সংশোধনের সময় নেই। এমনকি যতক্ষণ পর্যন্ত আচরণবিধি সংশোধন না হচ্ছে, ততক্ষণ রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী আইনপ্রণেতাদের প্রচারণায় অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।

এদিকে, তফসিল ঘোষিত সিটি নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচার থেকে এমপি-মন্ত্রীদের বিরত রাখতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। শিগগিরই নির্বাচন শাখা থেকে এ চিঠি পাঠানো

হবে। ইসির কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় থাকাবস্থায়ও দলীয় প্রভাব ছিল। তবে সেটা ছিল পরোক্ষ। কিন্তু দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন করার পর নিজ দল ও দল সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে স্থানীয়দের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতারাও মাঠে নেমে পড়েন। ভিআইপিরা স্থানীয় নির্বাচনের কোনো প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না; কারণ আচরণবিধিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রচারণার পথ বন্ধ রাখা আছে।

এ তালিকায় স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, মন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার ও এমপিরা রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী নাগরিক হওয়ার কারণে তাদের প্রচারণা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গত বৃহস্পতিবার তাদের একটি প্রতিনিধিদল ইসিতে এসে এমপিদের সিটি নির্বাচনে প্রচারণায় নামার সুযোগ চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা, চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করে। পরে বাইরে এসে সাংবাদিকদের এইচটি ইমাম বলেন, ‘আরপিও নিয়ে বাস্তবে অনেক সমস্যা হচ্ছে। আমরা সেই সমস্যাগুলো আলোচনা করেছি। আচরণবিধি যেন নির্বাচনে বাধার সৃষ্টি না করে। নির্বিঘেœ নির্বাচন করার জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ দিতে যেটুকু দরকার, সেটুকুই যেন তারা রাখেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেক সময় মন্ত্রীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সিটি করপোরেশনে যেসব এমপি আছেন, নির্বাচনের কারণে এলাকায় যেতে পারেন না। গাজীপুর বা খুলনায় তো অনেক এমপি আছেন। তাদের ওপর যদি ওরকম নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে তারা অচল হয়ে যাবেন। এ জিনিসটি বাস্তবায়নমূলক যেন হয়, সেই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

এমপিদের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে তিনি ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনপ্রতিনিধারা নির্বাচনে প্রচারণা চালান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন। আমাদের জনপ্রতিনিধিদের প্রচারণার সুযোগ চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিয়েও কথা বলেছে একটি দল। ওনারা জানেন না নির্বাচনে জয়লাভের পরদিন থেকে দলগুলোকে পরের নির্বাচনে প্রচারণার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। আর আমাদের দলের সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগের খরচে জনসভা করেছেন, রাষ্ট্রীয় টাকায় নয়।’

এদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে সিইসির বরাত দিয়ে ইসি সচিব বলেন, এগুলো কমিশন সভায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আইনসঙ্গত বিষয় বিবেচনা করে ইসি সিদ্ধান্ত নেবে।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সুখকর নয় বলে মনে করেন দেশের নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভিআইপিদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারণার সুযোগ না থাকার পরও অনেকে উৎসাহী হয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মঞ্চে উঠে পড়েন। এতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণœœ হয়। সব দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ থাকে না। এখন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিদের প্রচারণার সুযোগ চেয়ে বিধি সংশোধনের দাবি তুলেছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দাবি অনুযায়ী ইসি আচরণবিধিতে সংশোধান আনলে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কমিশন।

এমনিতেই আচরণবিধি মেনে চলার প্রবণতা আমাদের দেশের প্রার্থীদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেই। আর অবাধ সুযোগ দেওয়া হলে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবেন তারা। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, এমপিদের নির্বাচনের প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য আচরণবিধি সংশোধনের পরিবর্তে আরো কঠিন শর্ত আরোপ করাই শ্রেয়, যাতে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকালীন সময় তারা নিজ নির্বাচনী এলাকায় না যেতে পারেন। এ ধরনের শর্তজুড়ে আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনা হলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের যে প্রবণতা রয়েছে, তা কমে আসবে। এমনকি আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও প্রার্থিতা বাতিলের মতো বিধিবিধান যুক্ত করতে হবে।

"