পহেলা বৈশাখ : স্বাগত ১৪২৫

বাঙালির প্রাণের উৎসব আজ

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রুবাষ্প সুদূরে মেলাক।’ হ্যাঁ, সেই সুদূরেই মিলিয়েছে আরো একটি বছর। হারিয়েছে কালের গর্ভে। শুদ্ধ সুন্দর এ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আজ নতুন করে দিন শুরু করবে বাঙালি। পুরনো শোক-তাপ-বেদনা-অপ্রাপ্তি-আক্ষেপ ভুলে অপার সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করবে। দুই হাতে অন্ধকার ঠেলে, ভয়কে জয় করার মানসে জেগে উঠবে। আজ শনিবার অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক জাগরণের পহেলা বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন-বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আজ একাত্মা হয়ে গাইবে- ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ...।’ আনন্দে উৎসবে মাতবে গোটা দেশ। কবিগুরুর ভাষায়, ‘নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে/শুভ্র সুন্দর প্রীতি-উজ্জ্বল নির্মল জীবনে...।’ একই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে নজরুল লিখেছেন, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর...।’

সেই জয়ধ্বনিতেই নতুন বছরকে বরণ করে নেবে বাঙালি। নতুন স্বপ্ন বুনবে কৃষক। হালখাতা খুলবেন ব্যবসায়ীরা। নববর্ষ বরণে রাজধানীসহ সারাদেশে একযোগে চলবে লোকজ ঐতিহ্যের নানা উৎসব। আজ ছুটির দিন। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে নববর্ষের বিশেষ সংখ্যা। টেলিভিশন-রেডিওতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে বাংলা নববর্ষ বরণে নানা উৎসব ও আয়োজনকে ঘিরে রমনা বটমূল ও হাতিরঝিল এলাকায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ। পহেলা বৈশাখ ঘিরে রমনা বটমূলে র‌্যাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের পর গতকাল শুক্রবার দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, বর্ষবরণের দিন যৌন হয়রানিসহ অন্য অপরাধে তাৎক্ষণিক সাজার ব্যবস্থা করতে রমনা বটমূল ও হাতিরঝিল এলাকায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে। পাশাপাশি লাখো-লাখো লোকের সার্বিক নিরাপত্তায় র‌্যাবের হেলিকপ্টার ও সাদা পোশাকে টহলসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার বাংলা বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ধূমপান করলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেছেন, বৈশাখের অনুষ্ঠানস্থল ধূমপানমুক্ত রাখতে নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ করবে। এ জন্য অনুষ্ঠানস্থলে ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে। কেউ অনুষ্ঠানস্থলে ধূমপান করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজধানীর সব পথ মিলবে রমনা বটমূলে : বহু বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রমনা বটমূলে ভোরে আয়োজন করা হয় বর্ষবরণের প্রধান উৎসবের। ষাটের দশকে বাঙালি চেতনার উন্মেষকালে পাকিস্তানি মূর্খদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রথমবারের মতো অসাম্প্রদায়িক এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। বর্তমানে এই আয়োজন ছাড়া যেন অপূর্ণ থেকে যায় বৈশাখ বরণ।

মঙ্গল শোভাযাত্রা : বর্ষবরণের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনটির নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে এবারও বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রা বের করা হবে। শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় এটি চারুকলায় এসে শেষ হবে। শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন সব শ্রেণি, পেশার, বয়স, বর্ণের মানুষ।

চাই পান্তা-ইলিশ : পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের খুব সম্পর্ক নেই; ছিল না। কিন্তু তাতে কী? রাজধানী শহরে পহেলা বৈশাখ মানেই যেন পান্তা-ইলিশ। শুঁটকি ভর্তা, আচার ইত্যাদি দিয়ে মজা করে খাওয়া হবে আজ। ঘরে, বিভিন্ন মেলায়, উৎসবে আয়োজন থাকবে পান্তা-ইলিশ। তবে, দাম বেশি, অগ্নিমূল্য। তাতে কী? শহুরে মানুষ ইতোমধ্যে ফ্রিজ ভরেছে ইলিশ মাছে!

শুভ হালখাতা : চৈত্রের শেষ দিনে গতকাল ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের বিকিকিনির সব হিসাবনিকাশ চুকিয়ে দিয়েছেন। আজ পহেলা বৈশাখে তারা হালখাতা খুলবেন। নবোদ্যমে শুরু করবেন ব্যবসা। ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঢাকায় এখনও হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে স্বর্ণকার ও কাপড় ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মিত ক্রেতাদের আগে থেকেই গ্রিটিংস কার্ডের মাধ্যমে নিমন্ত্রণ জানান। আজ দোকানে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করবেন তারা। পুরনো পাওনা শোধ করে নতুন খাতায় হিসাব খুলবেন ক্রেতারা।

 

"